অতিরিক্ত হাঁচি ও হে-ফিভার

পরামর্শ স্বাস্থ্য

নাম শুনে মনে হতে পারে, এটি বোধ হয় একটি বিশেষ ধরনের ফিভার বা জ্বরের প্রকারভেদ। কিন্তু আসলে ফিভার বা জ্বরের সাথে এর কোনো সম্পর্কই নেই। প্রকৃত পক্ষে এটি একটি বিশেষ ঋতুভিত্তিক হাঁচিজনিত এলার্জিক রোগ। এটি একটি বিশেষ ঋতুতে প্রতি বছর এবং বছরের পর বছর ওই রোগীর উপসর্গ হতে দেখা যায় এবং এসব রোগীর ক্ষেত্রে নাক ও চোখ দিয়ে জল পড়তেও দেখা যায়।

নারী-পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই এটা সমভাবে হতে পারে এবং অল্প বয়স্কদের ক্ষেত্রেই বেশি হয়। উপসর্গ বা লক্ষণগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে তীব্র আকারে দেখা দেয়ায় প্রচণ্ড কষ্টদায়কও হতে পারে আবার হালকা বা সামান্য উপসর্গ নিয়েও দেখা দিতে পারে। যেহেতু একটি বিশেষ ঋতুতে এই রোগটি দেখা দেয় কাজেই সেই ঋতুর সাথে নিঃসন্দেহে এর সম্পর্ক রয়েছে। ওই একটি বিশেষ সময়ে বাতাসে যে ফুলের রেণু উড়ে বেড়ায় সেই ফুলের রেণুর প্রভাবেই মূলত এই রোগটি দেখা দেয় এবং এতে যারা আক্রান্ত হয় তাদের মধ্যে বংশানুক্রমিক এলার্জিক প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

এ রোগের প্রধান লক্ষণ হচ্ছে- হাঁচির সাথে তালু, চোখ ও নাকে জ্বালা ভাব থাকতে পারে। নাক ও চোখ থেকে পানি পড়বে এবং তীব্র হাঁচির প্রভাব থাকবে সকালের দিকে। সকালের দিকে এর তীব্রতার কারণ হচ্ছে ওই বাতাসের পুষ্পরেণুর উপস্থিতি থাকে সবচেয়ে বেশি। হাঁচির সাথে থাকতে পারে কাশি। এর সাথে আরো থাকতে পারে হাঁপানি। তবে সাধারণত এই হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট কম ক্ষেত্রেই উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। তবে হাঁচি কাশি ও হাঁপানি একই সাথে উপস্থিত নাও থাকতে পারে। এর বাইরেও থাকতে পারে খাদ্য গ্রহণের অনিচ্ছা, শারীরিক দুর্বলতা ও অধিক নিদ্রার প্রবণতা।

এই রোগকে সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে রোগীর পারিপার্শ্বিক বা বংশানুক্রমিক ইতিবৃত্ত অবশ্যই ভালোভাবে জানা প্রয়োজন। সেই সাথে অবশ্যই যে পুষ্পরেণুতে রোগীর এলার্জি রয়েছে তা অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন পুষ্পরেণুর নির্যাস দিয়ে স্কিন টেস্ট করলে তা জানা যায়। আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেহেতু প্রকৃত এলার্জি সৃষ্টিকারী পুষ্পরেণু শনাক্ত করা যায় তাই নির্দিষ্ট সেই পুষ্পরেণুর নির্যাস ব্যবহার করে হাইপোসেনসিটাইজেশন পদ্ধতিতে চিকিৎসা করলে ভালো ফলাফলও পাওয়া যায়।

অন্য সব এলার্জির বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে যেমন অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহার করা হয় এ ক্ষেত্রেও তা অবশ্যই করা প্রয়োজন। তবে কোনো অ্যান্টিহিস্টামিন এ ক্ষেত্রে রোগীর জন্য কার্যকরী তা একাধিক অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহারের মাধ্যমে কোনটি উপযুক্ত তা নির্ণয় করে নিয়ে সেটি ব্যবহার করলে যথার্থ ফল পাওয়া যাবে। এলার্জিক বিক্রিয়ার ফলে যে হিস্টামিন তৈরি হয় তা নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা ওই ওষুধের সমভাবে নাও থাকতে পারে। তাই যার ক্ষেত্রে সেটা উপযুক্ত তাকে সেটাই দিতে হবে।

তবে এই ক্ষেত্রে অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধের প্রয়োগ যে অতিশয় ফলপ্রসূ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে উপযুক্ত চিকিৎসা কিন্তু হাইপোসেনসিটাইজেশন পদ্ধতি। এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রকৃত এলারজেনটি খুঁজে বের করে তাকে নিষ্ক্রিয় করা হয়। তবে এই পদ্ধতির ব্যবহার আমাদের দেশে এখনো অনেকটাই সীমিত। সাধারণভাবে অ্যান্টিহিস্টাসিনই এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। যদিও তাতে কিছু কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে যেমন অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই এতে ঘুম ঘুম ভাব দেখা দেয়। তবে এ ধরনের সব ওষুধের ঘুম ভাবের ক্ষমতা কিন্তু সমপরিমাণ নয়। কোনটি বেশি আবার কোনটিতে কম ঘুমভাব হয়। যেটিতে বেশি ঘুমভাব হয় ওই ধরনের অ্যান্টিহিস্টামিন অবশ্যই রাতে খাওয়া উচিত এবং এ ধরনের ওষুধ খেয়ে কখনোই গাড়ি চালানো উচিত নয়।

এ ছাড়াও আবার কোনো কোনো অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহারের ফলে কেন্দ্রীয় স্নায়ুমণ্ডলীর উত্তেজনা দেখা দেয় এবং সে ক্ষেত্রে রোগীর মধ্যে মানসিক চাপ, অনিন্দ্রা দেখা দিয়ে থাকে। কাজেই অকারণে অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহার কখনই সঙ্গত নয় এবং দীর্ঘ দিন ধরে তা ব্যবহার করাও উচিত নয়। যারা হে-ফিভাবে ভোগেন তাদের মনে রাখতে হবে ওই সুনির্দিষ্ট ঋতুতে আক্রান্তের খামারে বা বাগানে কাজ করা উচিত নয়। ঘরের জানালা বন্ধ রাখা উচিত। অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হলে এয়ারকন্ডিশনার চালালে ভালো থাকা যেতে পারে। ওই রোগীদের ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা চালানো উচিত অন্যথায় স্থায়ীভাবে রোগীর নাকের ও সাইনাসের শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির ক্ষতি হতে পারে।

লেখক : চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ, আলরাজি হাসপাতাল, ১২, ফার্মগেট, ঢাকা।