এই কারণেই তো মিলার একজন ‘কিলার’!

ক্রিকেট খেলাধুলা প্রধান খবর

১৮ ওভার শেষ। দক্ষিণ আফ্রিকার তখন সংগ্রহ ৪ উইকেটে ১৭৮। ২৫ বলে ৫৭ ডেভিড মিলার। এই মিলার ১১তম ওভারে ০ রানে মুশফিকুর রহীমের কল্যাণে নতুন জীবন পেয়েছিলেন। তারপর ধ্বংসযজ্ঞ শুরু। এবং শেষ দুই ওভারে কি হলো? ১৯তম ওভারে সাইফ উদ্দিনের প্রথম ৫ বলে টানা ৫টি ছক্কা মারলেন। আরেকটু হলে ভাগ বসাচ্ছিলেন যুবরাজ সিংয়ের সেই ৬ বলে ৬ ছক্কা মারার রেকর্ডে! সেই অর্থে স্টুয়ার্ট ব্রডের মতো অতো অভাগা হননি সাইফ উদ্দিন। কিন্তু কোনো রান না করেই ফিরে যাওয়ার কথা যে মিলারের সেই কিলার মিলার গড়েছেন টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের নতুন ইতিহাস। ৩৫ বলে সেঞ্চুরি করে আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরির মালিক এখন মিলার। শিকার বাংলাদেশ। খুনি মিলার।

পচেফস্ট্রুমে এই ম্যাচটাকে বাংলাদেশ একটু অন্যভাবে নিয়েছিল। রোববারের আগে অধিনায়ক সাকিব আল হাসান জেগে ওঠার ডাক দিয়েছিলেন। বাঘদের ঝাঁপিয়ে এ পড়ে বিজয় ছিনিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। টসে জিতে আগে বোলিংয়ে নিজেই শুরুতে ২ উইকেট নিলেন সাকিব। পথ দেখালেন। হাশিম আমলা তবু মেরে চলেন। সবাই ভাবলো তারই সেঞ্চুরি হবে। কিন্তু যুবা সাইফ উদ্দিন পরপর দুই উইকেট নিলেন। ৫১ বলে ৮৫ রান করে ফিরলেন আমলা। তারপর সারা বিশ্ব দেখলো, কেন মিলারকে ‘কিলার’ বলা হয়!

৯.৫ ওভারে ৭৮ রানে ৩ উইকেট দক্ষিণ আফ্রিকার। বাংলাদেশ তো টার্গেট করা ১৮০ রানের মধ্যে প্রোটিয়াদের সফরের শেষ ম্যাচটিতে বেধে ফেলতেই পারে! কিন্তু আমলার সাথে মিলার যোগ হলে কি হয়? আরো দ্রুত রানের চাকা ছোটে। আমলা দলের ১৫৭ রানের সময় ফেরেন। ১৬.৩ ওভার তখন। এরপর মিলারের সাথে থাকা ফারহান বেহারডিনও গুনমুগ্ধ দর্শক! তিনি আর মাত্র ৫ বল খেলার সুযোগ পেলেন। ৩৬ বলে ৭ চার ও ৯ ছক্কায় রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়লেন মিলার। অপরাজিত ১০১ রানে। প্রোটিয়ারা পেলো ৪ উইকেটে ২২৪ রানের হিমালয় সমান সংগ্রহ। পরের ফিফটি করতে মাত্র ১২ বল লেগেছে মিলারের! শেষ ওভারে সেঞ্চুরি হয়েছে। আর দ্রুততম ফিফটির রেকর্ডটা যুবরাজের আছে ১২ বলেই।

২৩ বলে ফিফটি করেছিলেন মিলার। নাম কিলার। টি-টুয়েন্টিতে দুটি সেঞ্চুরি আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টিতে এতোদিন সর্বোচ্চ ছিল অপরাজিত ৫৩! অথচ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন ৫৬টি! এটি ৫৭তম! মনে রাখতে হয় মিলার ৫/৬ এ খেলেন। এবং তার আগে এমন সব বিপজ্জনক ও বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান দক্ষিণ আফ্রিকার যে মিলার ধুম-ধারাক্কা মেরে ম্যাচটা জিতিয়ে দিয়ে আসেন। বা সেই চেষ্টাই করেন। তার খুব বড় রান করার মতো সময় সুযোগ থাকে না।

এদিনও তো মাত্র ১০ ওভার পেলেন। আর তাতেই প্রমাণ করলেন, টি-টুয়েন্টিতেও এক ব্যাটসম্যান ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকাতেই পারেন! রিচার্ড লেভি নামের একজন ব্যাটসম্যান ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। কেউ তাকে চিনতো না। কিন্তু সেই লেভি ২০১২ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৫ বলে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন। এতোদিন তিনিই ছিলেন টি-টুয়েন্টি আন্তর্জাতিকের দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ান। ইনজুরির কারণে খেলতে না পারা নিয়মিত অধিনায়ক ফ্যাফ ডু প্লেসির ২০১৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আছে ৪৬ বলের সেঞ্চুরি। এখন তাই ২০ ওভারের ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম তিনটি দ্রুততম সেঞ্চুরির মালিক দক্ষিণ আফ্রিকান! ৫০ বলের নিচে সেঞ্চুরি আছে আর মাত্র ৫টি। এসবের সাথে কী দীর্ঘ ব্যবধানই না এখন মিলারের!

বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যানকে এখন থেকে নিশ্চয়ই নিয়মিত দুঃস্বপ্নে দেখে আঁতকে উঠবেন ২০ বছরের সাইফ উদ্দিন। কি চমৎকারই না বল করছিলেন। অথচ সতীর্থ রুবেল হোসেন এবং মাহমুদউল্লাহ নিশ্চয়ই এখন ধন্যবাদ দেবেন তাকে! আর ব্রড এই ম্যাচের দিকে তাকিয়ে থাকলে লজ্জার রেকর্ডে সাইফ উদ্দিনকে নিশ্চয়ই সঙ্গী হিসেবে পেতে প্রার্থনায় বসেছিলেন! ২০০৭ সালে তাকেই তো ৬ বলে ৬ ছক্কা মেরেছিলেন যুবরাজ!

কিন্তু রুবেল আর মাহমুদউল্লাহ কেন? টি-টুয়েন্টি ইন্টারন্যাশনালে এক ওভারে সর্বোচ্চ ৩৬ রান দেওয়ার রেকর্ডটি ব্রডের। এদিন সাইফ উদ্দিন দিলেন ৩১ রান। ৩২ রান দেওয়ার ঘটনা আছে ৩ বার। ৩১ রান দেওয়ার ফাঁকা জায়গা পূরণ হলো সাইফ উদ্দিনে! ৩০ রান দেওয়ার ইতিহাস ৩টি। ২৯ রান এসেছে ৩ বার। রুবেলের নাম আছে ওই এক ওভারে ওই ২৯ রান দেওয়ার রেকর্ডে, বাংলাদেশের হয়ে এক ওভারে সবচেয়ে খরুচে বোলারের রেকর্ডটা মিলার রুবেলের হাত থেকে এদিন সাইফ উদ্দিনের হাতে দিলেন। রুবেল ওটা করেছিলেন ২০১২ সালে। আর মাহমুদউল্লাহ এই বছরের গোড়ায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৮ রান দিয়ে রুবেলের পরের জায়গাটিতে ছিলেন।

ও, মিলারের এদিন কিন্তু টি-টুয়েন্টিতে হাজার রানও হয়েছে। যে ক্লাবের সদস্য খুব বেশি নেই এখনো। বিশেষ করে তার মতো নিচের দিকের ব্যাটসম্যানদের সংখ্যা তো ওখানে নেই বলতে গেলে!