ওই তো বয়স বাড়ছে আর আয়ু কমছে: রুনা লায়লা

বিনোদন সাক্ষাৎকার

৫২ বছর ধরে শ্রোতাদের সুরের সাতসাগরে ভাসাচ্ছেন বাংলাদেশের সংগীতশিল্পের জীবন্ত কিংবদন্তি রুনা লায়লা। সংগীতপিপাসুরা তার মোহময় গায়কীতে আচ্ছন্ন আজও। এই জাদুকরি মূর্ছনায় মন্ত্রমুগ্ধ কোটি কোটি শ্রোতা।

১৯৬৫ সাল থেকে শুরু, এরপর শ্রোতাদের অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন রুনা লায়লা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন তিনিই। অনন্য কণ্ঠ, অধ্যবসায়, একাগ্রতা, চর্চা, সময়জ্ঞান— সব মিলিয়ে এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এসেও তাঁর তুলনা শুধুই তিনি। সবশ্রেণির জনপ্রিয়তা, সাফল্য ও প্রাপ্তি, সবই আলোকিত করেছে এই গুণী শিল্পীকে।

তারকাদের তারকা রুনা লায়লার জন্মদিন আজ, ১৭ নভেম্বর। এবার ৬৫ বছরে পা রাখলেন তিনি। স্বামী, সন্তান, পরিবার আর স্বজন আর ভক্তদের শুভেচ্ছায় সিক্ত হচ্ছেন তিনি।

জন্মদিন উপলক্ষে ডিবিএনের সঙ্গে কথা বললেন রুনা লায়লা।

ডিবিএন:

 শুভ জন্মদিন। আপনাকে বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

রুনা লায়লা: আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
ডিবিএন: বয়স বিচারে ৬৫ বছর হলো। কেমন লাগছে?
রুনা লায়লা: ওই তো বয়স বাড়ছে আর আয়ু কমছে!
ডিবিএন: ৬৫তম জন্মদিন কিভাবে উদযাপন করছেন?
রুনা লায়লা: আলাদা কিছু না। জন্মদিনে বিশেষ কোনও পরিকল্পনা করি না। যা কিছু হয় সেসবের কৃতিত্ব আলমগীর সাহেবের। তিনি আমাকে চমকে দিতে চান। রাত ১২টা বাজলেই তিনি, আমার ভাই মুরাদ আর আমার মেয়ে তানি শুভেচ্ছা জানায়।
ডিবিএন: আজ কার কার কথা মনে পড়ছে?
রুনা লায়লা: আমার জীবনের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মা, বাবা আর বড় বোনকে খুব মনে পড়ে। শুধু জন্মদিনেই নয়, প্রতিটি দিন তাদের শূন্যতা অনুভব করি। তাদের জন্যই গাইতে পেরেছি। জন্মদিনে মেয়ে আর নাতিরা কাছে থাকলে ভালো লাগতো। দেশের বাইরে তানির ওখানে (লন্ডন) জন্মদিন উদযাপন করেছিলাম একবার।
ডিবিএন: ২০১৭ আপনার সংগীত জীবনের জন্য বিশেষ। কারণ এ বছর প্রথমবার গান সুর করেছেন আপনি…
রুনা লায়লা: এটা আসলে হুট করেই হয়েছে। একদিন আঁখি (আঁখি আলমগীর) বললো, আপনি গান সুর করলে ভালো হবে। তাকে বললাম— আমি তো কখনও সুর করিনি। কিভাবে সুর করে তাও জানি না! তবুও তুমি যেহেতু বলছো চেষ্টা করে দেখি। তো একটা গানের মুখ সুর করে আলমগীর সাহেবকে শোনালাম। তার অভিব্যক্তি দেখে সুবিধের মনে হলো না! এর কয়েকদিন পর তিনি জানতে চাইলেন, অন্তরা সুর করেছি কিনা। আলমগীর সাহেব তার পরিচালিত ‘একটি সিনেমার গল্প’তে রেখেছেন গানটা। এই তো এভাবেই সুরকার হয়ে গেলাম!
ডিবিএন: ২০১৮ আসতে আর দেড় মাসের মতো বাকি। নতুন বছরে দেশ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
রুনা লায়লা: দেশের ব্যাপারে আমি খুব ইতিবাচক। আমি বিশ্বাস করি, আমরা প্রত্যেকেই দেশটাকে অনেক ভালোবাসি। দেশপ্রেম সবার মধ্যেই আছে। ভেদাভেদ ভুলে আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমার আশা, বাংলাদেশ ক্রমে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। যত নেতিবাচক ব্যাপারই ঘটুক না কেন, দেশের জন্য আমরা ঠিকই এগিয়ে আসি।
রুনা লায়লা, ছবি- মোহসীন আহমেদ কাওছার

ডিবিএন: এ দেশে নতুনদের জন্য কি গান শেখার উপযুক্ত ব্যবস্থা দেখেন?
রুনা লায়লা: একেবারে যে নেই তা না। তবে পরিপূর্ণ শিল্পী হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য তেমন ভালো ওস্তাদ আমাদের দেশে হাতেগোনা। তাই গুণী শিল্পীদের গান শুনতে হবে নিয়মিত। যতটা পারা যায় সাধনা করে যেতে হবে। নবীনদের আমি সবসময় উৎসাহ দিতে চেষ্টা করি। ভালো লাগলে ফেসবুকে তাদের গাওয়া গানের লিংক শেয়ার করি।
ডিবিএন: শিল্পীদের মধ্যেও আপনার অনেক ভক্ত। আপনার কাছ থেকে সবাই শেখে। আপনি কাদের দেখে শিখেছেন?
রুনা লায়লা: শৈশব থেকে লতাজি (লতা মঙ্গেশকর), আশাজি (আশা ভোঁসলে), নূরজাহান, ফেরদৌসী আপা (ফেরদৌসী রহমান), আঞ্জুমান আরা আপার গান বেশি শুনতাম। তাদের গান শুনে শুনেই বেড়ে উঠেছি আমি। গানের ব্যাপারে আমি খুব আন্তরিক। সবসময় সাধনা করেছি। এখনও করছি। আন্তরিকতা, সততা, রেয়াজ আর পরিশ্রমের কমতি রাখিনি। আমি পেশাদারিত্ব আর নিয়মানুবর্তিতায় বিশ্বাস করি। এজন্য একটা শৃঙ্খলার মধ্যে চলি।
ডিবিএন: নিজের কোন ইচ্ছাটা পূর্ণ হয়নি?
রুনা লায়লা: মানুষের সেবায় আসতে পারলে খুব ভালো লাগে আমার। যতদিন আমার পক্ষে সম্ভব সেই চেষ্টা করবো। বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে কাজ করেছি। সার্কের শুভেচ্ছাদূতের দায়িত্বেও ছিলাম। ইচ্ছা আছে একটি ক্যানসার হাসপাতাল গড়ার। আমার বোন দীনা লায়লা ক্যানসারে মারা গেছেন। হাসপাতালটি যদি গড়তে পারি তাহলে তাতে তার নামই দেবো।
ডিবিএন: সাতবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পাকিস্তানের নিগার অ্যাওয়ার্ড, গিনেস রেকর্ডসহ আপনার প্রাপ্তি অনেক। কোনও অপূর্ণতা আছে?
রুনা লায়লা: অনেক কিছু পেয়েছি। বাংলাদেশের পাশাপাশি বিদেশেও অনেক সম্মান ও ভালোবাসা জুটেছে। মানুষের এই ভালোবাসাই আমার জীবনের অন্য সব প্রাপ্তির ওপরে।
ডিবিএন: ৬৫তম জন্মদিনে শ্রোতা-ভক্তদের জন্য কিছু বলবেন।
রুনা লায়লা: সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি যেন সবসময় সুস্থ থাকতে পারি। মানুষকে আরও ভালো ভালো গান উপহার দিতে চাই। সবার ভালোবাসা আর দোয়া থাকলে আমৃত্যু গান করে যাবো।