কত ছুটি কাটান হাথুরু?

ক্রিকেট খেলাধুলা

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের প্রতিটি ম্যাচে বাংলাদেশ যেভাবে হেরেছে, তা নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রধান নাজমুল হাসান। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সংবাদমাধ্যমের সামনে নাজমুল স্পষ্টই নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দল দক্ষিণ আফ্রিকায় কেন এত বাজে খেলল, তার কারণ তিনি জানতে চাইবেন কোচ, ম্যানেজার ও অধিনায়কদের কাছে। ম্যানেজার আর অধিনায়কেরা হাতের কাছেই আছেন। কিন্তু কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে নেই, তিনি আপাতত ছুটিতে।

বিষয়টি জানাতেই নাজমুল বেশ উচ্চকণ্ঠেই বললেন, ‘সে যদি এখন ছুটিতে থাকে, তাকে আনার চেষ্টা করতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে প্রধান কোচের মতামত আমাদের জানা দরকার। আমাদের পারফরম্যান্স কেন এমন হলো? তার কী মন্তব্য? তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ করতে হবে। তার সঙ্গে কথা বলব। আমাদের জন্য এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’

ছুটিটা একটু বেশিই কাটান বাংলাদেশের কোচ। ফাইল ছবি

যেকোনো সফর কিংবা সিরিজ শেষে হলেই বাংলাদেশের হেড কোচের ছুটিতে চলে যাওয়া নতুন কিছু নয়। শ্রীলঙ্কান এই কোচ মূলত থাকেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফর শেষেই তিনি সেখানেই চলে গেছেন। বিসিবি সূত্র জানিয়েছে, ১২ ডিসেম্বর বিপিএল শেষ হওয়ার আগে তাঁর ফেরার সম্ভাবনা নেই। যদি বিসিবি সভাপতি চাপ না দেন, তাহলে দেড় মাসের ছুটি কাটিয়েই তিনি ফিরবেন। প্রশ্ন হচ্ছে, চুক্তি অনুযায়ী হাথুরু বছরে কত দিন ছুটি পান?

হাথুরুর অতিরিক্ত ছুটি কাটানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে এর আগেও। ২০১৪ সালের জুন থেকে ২০১৬ সালের জুন—প্রথম চুক্তিতে (দুই বছরের) বছরে ৪০ দিন ছুটি পাওয়ার কথা ছিল তাঁর। অথচ তিনি দুই বছরে ছুটি কাটিয়েছিলেন ২২০ দিন! গত বছরের জুনে বিসিবির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন হয়েছে তাঁর। বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচের দায়িত্বে হাথুরু আছেন ২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত। নতুন চুক্তিতেও যে তাঁর ছুটিছাটার বিষয়ে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি, সেটি বোঝা গেল বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর কথায়, ‘নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই তাঁকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। আর দশটা চাকরির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কোচদের চাকরি মেলানো যাবে না। তাঁরা কিন্তু অন্য চাকরির মতো সাপ্তাহিক ছুটি পান না। তবে সবকিছুই পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ৪০ দিন ছুটি পাওয়াটা হচ্ছে একটা বিশেষ মানদণ্ড। সেভাবেই তাকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সবকিছু হয়।’

হাথুরুর ছুটি নিয়ে বিসিবি সভাপতিও প্রায় একই কথা বললেন, ‘পরিকল্পনার বাইরে তার ছুটি থাকে না। তার সঙ্গে আমাদের একটা সূচি আছে। সে পেশাদার। সূচি অনুযায়ী যখন তার ছুটিতে যাওয়া দরকার, সে তখনই ছুটিতে যায়। যখন এখানে থাকার কথা দরকার সে থাকে।’

পারিবারিক প্রয়োজনে কিংবা কোনো সফর বা সিরিজ শেষে ক্লান্তি দূর করতে কোচ ছুটি নিতেই পারেন। প্রশ্নটা উঠছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ছুটি কাটানো নিয়ে। গত ১৬ মাসে হাথুরুসিংহে ছুটি কাটিয়েছেন প্রায় ১৫০ দিন! এই সময়ে তাঁর ৬০ দিনের বেশি ছুটি পাওনা থাকার কথা নয়। বেতনের দিক থেকে ক্রিকেট বিশ্বে যে কোচের অবস্থান চতুর্থ স্থানে, যাঁর মাসিক বেতন প্রায় ২৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা (প্রথম চুক্তিতে ছিল প্রায় ১৮ লাখ), তাঁর কর্মদিবস কেন বেশি হবে না?

কোনো সিরিজ বা টুর্নামেন্টে কী ভুল হলো, কোথায় আরও উন্নতি করার দরকার, সেটি নিয়ে কাজ করার সেরা সুযোগ বিরতিতেই। বাংলাদেশ দল যখনই এমন লম্বা বিরতি পায়, বেশির ভাগ সময়ই কোচ থাকেন ছুটিতে। গত বছর মার্চে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর প্রায় দুই মাস ছুটি কাটিয়ে তিনি ঢাকায় ফেরেন ২০১৬ সালের ১ জুনে। ১৯ দিন পর আবার সিডনিতে চলে যান কোচ। দেড় মাসের বেশি সময় ছুটি কাটিয়ে ফেরেন ৭ আগস্ট। ওই সময় প্রায় সাড়ে তিন মাস ছুটিতে ছিলেন হাথুরু। যদিও তখন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন খেলোয়াড়েরা। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে কে কেমন করছেন, সেটি দেখাও তো তাঁর দায়িত্ব। দল নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তো তিনি সরাসরিই যুক্ত।

গত সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের পর মাত্র এক দিন বাংলাদেশে ছিলেন হাথুরু। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের দল নিয়ে বিসিবি সভাপতির সঙ্গে সভা করেই উড়াল দিয়েছিলেন সিডনিতে। অথচ এই সময় কোর্টনি ওয়ালশকে দেখা গেছে জাতীয় দল ও জাতীয় দলের বাইরে থাকা বোলারদের নিয়ে কাজ করতে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরটা কেন এত বাজে হলো, সেটির ময়নাতদন্তের জন্যও তো কোচের ছুটিটা নেওয়া উচিত ছিল আরও কয়েক দিন পর। বিপিএল শুরু হচ্ছে ৪ নভেম্বর। ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগের কয়েকটি ম্যাচ দেখলেও তো শিষ্যদের ভুল-ত্রুটিগুলো চোখে পড়ত তাঁর। এত ছুটি নিয়ে জাতীয় দল নির্বাচনে তিনি শেষ পর্যন্ত কীভাবে ছুরি-কাঁচি চালাতে পারেন, সেটাই তো বড় এক রহস্য।