খেলার চেয়েও জীবন অনেক বড়

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল জিতে আনন্দে ভাসায় দেশের মানুষকে, আবার হেরেও যায়। হার-জিত তো খেলারই অংশ। পৃথিবীতে কী এমন একটি দল বা দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা কেবলই জেতে! জয়ের সঙ্গে পরাজয় ব্যাপারটি না থাকলে তো খেলারই জন্ম হতো না! এই সাধারণ বিষয়টা অনেকেই ভুলে যান। খেলাকে বানিয়ে ফেলেন জীবন-মরণ। নিছক বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে যে ব্যাপারের জন্ম, সেটিকে জীবন-মরণের বিষয় বানিয়ে ফেলা আসলে জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করা।

এটি সারা দুনিয়ারই বড় একটা সমস্যা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে খেলার ফল পক্ষে না এলে মানুষ বিষণ্নতায় ভোগা শুরু করে, হয়ে ওঠে হিংসাত্মক। এর নানা কারণও আছে। হাল আমলে খেলাধুলা পেশাদারি হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নানা অনুষঙ্গও যোগ হয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও খেলা সম্প্রচারের বিজ্ঞাপনে যে ভাষা ব্যবহার করছে, সেটিও কিন্তু এই বিষণ্নতা কিংবা অহেতুক উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট সিরিজকে কেন্দ্র করে এর সম্প্রচার সংস্থা খেলা প্রচারের বিজ্ঞাপনে একটি বাক্য ব্যবহার করছে, যা খেলাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা উসকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সেখানে বলা হচ্ছে, ভারত নাকি এবার দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট খেলতে গেছে ‘পঁচিশ বছরের হিসাব’ চুকাতে—কী ভয়ংকর কথা! ক্রিকেট নিছকই একটা খেলা। এই খেলাটিকে উপলক্ষ বানিয়ে একটি দেশ অন্য দেশ সফর করে শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে। কিন্তু এরই মধ্যে টেলিভিশন কোম্পানি যদি ‘হিসাব চুকানো’র বার্তা দর্শকদের দিতে থাকে, তাহলে সেখানে শুভেচ্ছা বিষয়টি আর থাকে না।
খেলায় এখন নানা রকম অনুষঙ্গ কাজ করে। ‘জাতীয়তাবাদ’ একটা বড় ব্যাপার। একটি দেশ যখন আরেক দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে মুখোমুখি হচ্ছে, সেটি আর নিছক খেলাই থাকছে না, রূপ নিচ্ছে ‘দেশের জন্য’ যুদ্ধে। খেলা ধরে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যেন উগ্র জাতীয়তাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম সহজলভ্য হয়ে যাওয়ার কারণে এটি আরও বাজে চেহারা নিয়েছে। কিছু মানুষ তো খেলার মধ্যে রাজনীতি টেনে নিয়ে এসে পুরো বিষয়টাকেই এমন বানিয়ে ছাড়ছেন, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ খুঁজে পাওয়াটাই মুশকিল হয়ে পড়ে। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
খেলাকে খেলার মধ্যে রাখার বিষয়ে জাতীয় ক্রিকেট দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার একটি কথা বলা যেতে পারে। অতি উৎসাহী অনেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের ‘এ যুগের মুক্তিযোদ্ধা’ বলার চেষ্টা করেন। মাশরাফি ব্যাপারটিতে খুব বিরক্ত। তিনি একবার এ বিষয়ে যা বলেছিলেন, সেটি অনেকটা এ রকমই—মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। দেশের জন্য তাঁদের ত্যাগ সীমাহীন। সেটার সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা চলে না। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁরা জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু আমরা ক্রিকেটার। ক্রিকেট খেলি, টাকা পাই। দেশের জন্য আমাদের কোনো ত্যাগ নেই। মাশরাফি নিজে একজন উঁচুমানের ক্রীড়াবিদ বলেই এমনটা বলতে পেরেছিলেন। তিনি আসলে যেটি বলতে চেয়েছিলেন, সেটি হচ্ছে ক্রিকেট বা অন্য যেকোনো খেলা নিছকই খেলা, এর সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের কোনো কিছুকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। জীবন অনেক বড়। খেলার চেয়েও জীবনে অনেক বড় বড় ব্যাপার আমাদের জীবনে ঘটে।
বহু বছর আগে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ খেলা নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলেন। তিনি যে সময় লেখাটি লিখেছিলেন, তখন ফুটবল ছিল এ দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিষয়। তিনি তাঁর সেই লেখায় ফুটবল-পাগল তাঁর এক বন্ধুর চরিত্র এঁকেছিলেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সাফ গেমসের পটভূমিতে সেই লেখায় উঠে এসেছিল খেলাকে নিছক খেলা হিসেবে না দেখলে একজন মানুষ কী ধরনের সামাজিক সমস্যা তৈরি করেন। সেবার বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল ঘরের মাঠে খুব বাজে ফল করেছিল। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে অবিসংবাদিত সেরা দল হয়েও তখনকার দুর্বল দল মালদ্বীপের সঙ্গে ড্র আর নেপালের কাছে হেরে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিয়েছিল বাংলাদেশ। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন মালদ্বীপের সঙ্গে ড্র করার পর তাঁর বন্ধুকে সামলাতে তাঁর বাসায় যেতে হয়েছিল তাঁকে। বন্ধুর মেয়ে ও স্ত্রী ফোন করে লেখককে সেখানে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। একটা জায়গায় বর্ণনা ছিল অনেকটা এমন, মালদ্বীপের সঙ্গে বাংলাদেশ ড্র করেছে। বন্ধু গুম মেরে বসে আছেন। কিছুক্ষণ পরপর চাপা স্বরে বিড়বিড় করে বলছেন, ‘মালদ্বীপের সঙ্গে ড্র, কী লজ্জা, কী লজ্জা!’ বাংলাদেশ পরের ম্যাচে নেপালের কাছে হেরে যাওয়ার পর লেখক আর সে বাসায় যাওয়ার সাহস করে উঠতে পারেননি। পাঠকও বুঝে গেছেন, নেপালের সঙ্গে হার লেখকের বন্ধুকে কতটা বিধ্বস্ত করেছিল!
২০০৩ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ কানাডার কাছে হেরে গিয়েছিল। সেবারও হুমায়ূন আহমেদের সেই ফুটবল-পাগল বন্ধুর মতোই অনেকে বলেছিলেন, ‘কানাডার কাছে হার! কী লজ্জা! কী লজ্জা!’ ক্রিকেটপ্রেমী অনেকেরই দুনিয়াটা খালি হয়ে গিয়েছিল সেই হারে। কিন্তু কেউই হয়তো ভুলে যাননি, সেই হারের পরদিনই ছিল পবিত্র ঈদুল আজহা। মানুষ কিন্তু ঠিকই ঈদ পালন করেছিল, সেই হারের দুঃখ ভুলে। জীবনটা এমনই। এই জীবনের খেলা অনন্য আনন্দের উৎস। জীবনের দুঃখ-কষ্ট ভুলতেই তো খেলার উৎসবে আমরা মাতি। সেটিকে অযথা কেন মাটি করা। খেলা তো নিছক খেলাই।

Comments

comments

Leave A Reply

Your email address will not be published.