রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেভাবে চলছে খ্রিস্টান মিশনারিদের অপতৎপরতা

অন্যান্য অপরাধ ও দুর্নীতি বাংলাদেশ

মুহাম্মাদ ইশতিয়াক সিদ্দিকী
রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে

স্বদেশ থেকে বিতাড়িত পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত শরণার্থীদের তালিকায় প্রথমে রয়েছে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নিগ্রহ ও নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গা মুসলিমগণ।

গত ৩০ বছরে কয়েক ধাপে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ ২০১৬ তে ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

বাংলাদেশ সরকারের হিসাব মতে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১১লাখ রোহিঙ্গা বাস করছে। তাদের সিংহভাগই মুসলিম।

এদিকে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্ব ও সরলতাকে পুঁজি করে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সবচেয়ে পুরাতন শরণার্থী ক্যাম্প কুতুপালং এর বি ব্লকে খ্রিস্ট ধর্মীয় উপাসনালয় গড়ে উঠেছে। দেয়ালে খ্রিস্ট ধর্মপ্রবক্তা যিশুর ছবি ও খ্রিস্টানদের ধর্মীয় নিশান ‘ক্রুশ’ এর ছবি আঁকা হয়েছে।

কুতুপালং বি ব্লকে অবস্থিত ক্রুশচিহ্ন সম্বলিত গীর্জা।

আওয়ার ইসলামের অনুসন্ধানে জানা যায়, কুতুপালং ক্যাম্পে মুদি দোকানদারির আড়ালে মুহাম্মদ নুরু ওরফে নুরু ফকির খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কাজ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় রোহিঙ্গারা এ নিয়ে প্রতিবাদ জানালেও কোন প্রতিকার পায়নি তারা।
রোহিঙ্গা জনসাধারণের প্রতিবাদ সমাবেশ সম্বলিত একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।

ভিডিওতে দেখা গেছে, তারা স্বজাতির লোকদের ধর্মত্যাগের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগে তাদের ধর্মান্তকরণের বিষয়টিও তুলে ধরে খ্রিস্টধর্ম প্রচারকের পরিচয় ঘোষণা করছেন।

ওই ভিডিও ছাড়াও খ্রিস্টধর্ম অনুকরণে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গাদের বিয়ের এক ছবি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোনার জন্ম নিয়েছে যা বিভিন্ন  সামাজিক মাধ্যমে এসেছে।

কুতুপালং ক্যাম্পে খ্রিস্টধর্ম অনুকরণে রোহিঙ্গাদের বিয়ে

ছবিতে নুরু ফকির, নরওয়ে প্রবাসি ছেলে ও এক নববধূসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের দেখা গেছে। আলাপচারিতার এক ফাঁকে প্রতিবেদককে নুরু ফকির বিয়ের অনুষ্ঠানটি নিজের ভাতিজির বলে দাবী করেন এবং অপপ্রচার না চালানোর অনুরোধ করেন।

কুতুপালং ক্যাম্পে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক নূরু ফকির

খ্রিস্টানদের প্রচারণা পদ্ধতি

ইলেক্ট্রিক ডিবাইস বিতরণ: অধিকাংশ রোহিঙ্গা অশিক্ষিত তাই তাদের খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করতে ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লকে ব্লকে ইলেক্ট্রিক ডিবাইস বিতরণ করা হচ্ছে। বিষয়টি একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ডিবাইসগুলোতে খ্রিস্ট্রিয় সঙ্গীত এবং যিশু ও খ্রিস্টধর্ম বিষয়ক ঘটনার বর্ণনা (ওয়াজ) রয়েছে।

খ্রিস্টধর্মের আলোচনা সম্বলিত ইলেক্ট্রিক ডিভাইস

খ্রিস্টধর্মীয় বই বিতরণ: খ্রিস্টানরা ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’ নামে তাদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল এর ইসলামী সংস্করণ বের করেছে বেশ আগে। মূলত মুসলমানদের ধোঁকা দিতে ও কাছে টানতে তারা এ অপকৌশল হাতে নিয়েছে। সফলও হচ্ছে বেশ।

কিতাবুল মোকাদ্দস, ইঞ্জিল শরীফ, তৌরাত শরীফ, নবীদের কিতাব ইত্যাদি ইসলামি পরিভাষায় প্রকাশিত বইগুলো রোহিঙ্গাদের মাঝে বিতরণ করছে খ্রিস্টানরা।

প্রতিবেদক সরেজমিনে গিয়ে এর প্রমাণও পেয়েছে। খ্রিস্ট ধর্মপ্রচারক নুরু ফকির প্রতিবেদককে একটি ইঞ্জিল শরীফও পড়ার জন্য উপহার দিয়েছে। কিতাবুল মোকাদ্দস (বাইবেল) থেকে কিছু অংশ পড়ে শুনিয়েছেন এবং তাদের কার্যক্রম নিয়ে বেশ আলাপও করেছেন।

আর্থিক ও পড়াশুনার সুবিধা:  অসহায়-অসচ্ছল ও অশিক্ষিত রোহিঙ্গাদের কাছে টানতে খ্রিস্টানরা ক্যাম্পে ক্যাম্পে স্কুল চালু করেছে। শিক্ষার্থীদের উন্নতমানের ব্যাগ ও শিক্ষাসামগ্রী দেয়া হচ্ছে। প্রতি রবিবার স্কুলে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও গানের আয়োজন করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত খ্রিস্টানদের সাপ্তাহিক পবিত্র দিন ‘ইস্টার সানডে’ পালন করে থাকে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত ২৫ ডিসেম্বর কুতুপালং ও থ্যাংখালিতে গরু জবেহ করে জমকালো আয়োজনে বড়দিন উদযাপন করা হয়। যেখানে ফাদারদের মাধ্যমে ধর্মীয় আলোচনার আয়োজন করা হয়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে খ্রিস্টানদের সংখ্যা কত?

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিশেষ করে কুতুপালংয়ে খ্রিস্টানদের জনসংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে রোহিঙ্গারা ধর্মপ্রাণ হওয়ায় সহজে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না মিশনারীগুলো।

কুতুপালংয়ে জাতিসংঘেরর অধীনে এনজিও সংস্থা ব্রাকের পক্ষ থেকে আদমশুমারি চলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জরিপকারী জানান, কুতুপালংয়ে প্রাথমিক হিসাবে ৫৭ পরিবার খ্রিস্টান রয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি বলে ধারণা করেন তিনি।

এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, সামাজিক চাপের ভয়ে অনেকে খ্রিস্টান ধর্মগ্রহণের পরিচয় প্রকাশ করছে না।

থ্যাংখালীর তমিজারখোলাতে রয়েছে খ্রিস্টানদের আরেকটি বসতি। প্রাথমিক তথ্য মতে, তমিজারখোলাতে রয়েছে ১৮টি পরিবার। তারা তমিজারখোলার বিভিন্ন পাহাড়ে বসবাস করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মাঝি (সমাজ লিডার) এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, তাদের নিয়ে আমরা খুব চাপে আছি। পান থেকে চুন খষলেই তারা প্রশাসনকে অভিযোগ করে।

এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের সাথে কথা বললে তারা জানান, যার যার ধর্ম পালন ও প্রচারের অনুমতি বাংলাদেশের সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। তবে তা হবে স্বজ্ঞানে, স্বেচ্ছায়। যেখানে কোন ধরণের জোরজবরদস্তি, লোভ, ধোঁকা থাকবে না।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে লোভ, অর্থসহায়তা ও ধোঁকার মাধ্যমে খ্রিস্টান মিশনারীরা ধর্ম প্রচার করছে। যা সংবিধান ও ধর্মবিরোধি কাজ।

সুত্রঃ আওয়ার ইসলাম