চিটিংবাজি করে চলছে সিটিং সার্ভিস নামের বাসগুলো

অন্যান্য

নগেন বাবু বরাবরই রগচটা টাইপের লোক। যতবারই তিনি আয়নার সামনে দাঁড়ান, টাক্কু মাথাটা দেখার পরপরই বারুদের মতো দপ করে জ্বলে ওঠেন। অথচ যৌবনের সূচনালগ্নে তিনি ঝাঁকড়া চুলের অধিকারী ছিলেন। তিনি বহু ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছেন। একবার এক ডাক্তার তাকে সরাসরি বলেই দিয়েছেন ‘আপনার মাথায় বায়ু চড়া। রাগ উঠলে আপনার মাথার তাপমাত্রা এক শ’ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে যায়। এত তাপমাত্রার মধ্যে চুলের চাষাবাদ কী করে সম্ভব বলুন?’
এরপর থেকে নগেন বাবু রাগকে কন্ট্রোল করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা হয়ে ওঠে না। আজ নগেন বাবুর বাসা থেকে হঠাৎ এক দুঃসংবাদ এলো। তাই নগেন বাবুর ভীষণ তাড়া। তিনি অফিস থেকে বের হয়ে এক দৌড়ে বাস ধরলেন। তিল ধারণের ঠাঁই নেই সেই বাসে। দুশ্চিন্তার সাথে ঘিঞ্জি পরিবেশ মিলে তার গা বেয়ে ঘাম ঝরছে টপটপ করে। তার ওপর কন্টাকটরের কথা শুনে হুট করেই মাথাটা গরম হয়ে গেল। কন্টাকটর বিশ টাকা ভাড়া নেবেন না। নগেন দা বললেন, ‘আসার সময় বিশ টাকা দিয়ে এলাম। এই সাত ঘণ্টায় ভাড়া বেড়ে গেল নাকি?’
কন্টাকটর বললেন, ‘ভাইজান, এটা সিটিং সার্ভিস, লোকাল বাস নয়।’
নগেন দা ডানে-বামে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘বাসে দাঁড়ানোর জায়গা নেই অথচ তুমি বলছ এটা সিটিং সার্ভিস। আরে মিয়া, এটা সিটিং সার্ভিস না স্ট্যান্ডিং সার্ভিস, সেটা কও।’
কন্টাকটরও দমার পাত্র নয়। সে বলল, ‘আপনারা স্ট্যান্ডিং হতে পারেন; কিন্তু আমার বাস সিটিং সার্ভিস। তা ছাড়া পাবলিকের বাসের জন্য অপেক্ষা করার মতো কষ্ট আমরা কী করে সহ্য করি বলুন। আমরা আপনার মতো পাষাণ নই। আমাদের হৃদয়ে দয়ামায়া আছে। বুঝলেন?’
পরের স্টেশনে অনেক যাত্রী নেমে গেল। নগেন দা দেখলেন, সামনের দিকে দু-তিনটা সিট খালি আছে। তিনি কালবিলম্ব না করে একটি সিটের দখল নিয়ে হাঁফ ছাড়লেন। কিন্তু বেশিক্ষণ তার কপালে সুখ সইল না। তার পরের স্টেশনে এক দাজ্জাল টাইপের মহিলা উঠে নগেন দার নাক বরাবর গিয়ে দাঁড়াল। বলল, ‘আপনি মহিলা সিটে বসে আছেন কেন? সিট ছাড়েন।’
নগেন দা বললেন, ‘আমার জানা মতে সিট হলো কিব লিঙ্গ। সিট আবার স্ত্রী লিঙ্গ হলো কবে থেকে?’
তাদের তর্ক শুনে কন্টাকটর এসে বলল, ‘ভাই, এই দেখেন লেখা আছেÑ সামনের ছয়টি সিট মহিলাদের জন্য নির্ধারিত।’
নগেন দা লেখার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, ‘তাইতো দেখছি!’
তিনি পেছনের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, চার-পাঁচ সারি পেছনে বসে এক মহিলা মিটমিট করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার রাগ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তিনি সিট ছেড়ে ওই মহিলাকে গিয়ে বললেন, ‘আপনি পুরুষ সিটে বসছেন কেন? দয়া করে সিট ছাড়–ন।’
মহিলা বেহায়ার মতো বসে থেকে বলল, ‘আপনি কি পাবনা থেকে এই মাত্র এলেন?’
কন্টাকটর আবার নাক গলাল। সে বলল, ‘ভাই, কী হচ্ছে এসব?’
নগেন দা এবার কন্টাকটরের ওপর ক্ষেপে গেলেন। বললেন, ‘এই বেটা, মহিলা-পুরুষ সমানাধিকার। মহিলাদের জন্য নির্ধারিত আসন রেখেছিস। সেই আসন খালি রেখে তারা পুরুষ সিটে বসে পা দোলায়। আর পুরুষেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাবে? এ কেমন আইন? বাসের মধ্যে দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না অথচ নাম রেখেছিস সিটিং সার্ভিস! আরে বেটা, সিটিং বলে আমাদের সাথে চিটিং করিস ক্যারে!’
কন্টাকটর নগেন দাকে ঝামেলা মনে করে বাস থেকে নামিয়ে দিলো।