‘জীবনের প্রথম ব্যাট ছিল গাছের ডালের’: লারা

ক্রিকেট খেলাধুলা

ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো নামের ছোট্ট দ্বীপ থেকে উঠে এসে তিনি সারা বিশ্বের আলো কেড়েছেন। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান ব্রায়ান লারা। গত ৪ সেপ্টেম্বর ‘এমসিসি স্পিরিট অব ক্রিকেট কাউড্রে লেকচার’-এ বক্তা ছিলেন তিনি। বলেছেন নিজের ছেলেবেলা, ক্রিকেট আর জীবনদর্শন নিয়ে নানা কথা…

প্রথমেই আপনাদের সতর্ক করে দিতে চাই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের যখন ২০০ রানে ১ উইকেট পড়ে, তখন মাঠে নামলে আমি আমার কাজটা ঠিক বুঝতে পারি না। আবার স্কোরবোর্ড যদি দেখায় ২৫ রানে ৩ উইকেট, তখন খুব ভালো করে জানি, আমার কাজ কী। চাপে পড়লে আমি সহজাত খেলাটা খেলতে পারি। এই বক্তৃতার বেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। বক্তৃতার অনুলিপি লেখা শুরু করেছিলাম ২০০ দিন আগে, তখন এক লাইনের বেশি এগোতে পারিনি। অবশেষে শেষ মুহূর্তে এসে একটা কিছু দাঁড়িয়েছে। অতএব, বুঝতেই পারছেন…

কিছুক্ষণ আগে এক নারীর সঙ্গে দেখা হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি এখনো লেডি চ্যান্সেলরে থাকেন?’ বললাম, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘সেখানে আমার জন্ম হয়েছিল।’ জানতে চাইলাম, ‘আপনার নামের শেষ অংশ কী?’ বললেন, ‘ডোসান্টোজ।’ আমি বললাম, ‘হুম। অ্যারল্ড ডোসান্টোজকে আমি চিনি। আমি যে বাড়িতে থাকি, একসময় তিনি সে বাড়ির মালিক ছিলেন।’

এই বাড়ির পেছনের গল্পটা বলি। ছোটবেলায় আমি ফ্যাটিমা কলেজ নামের একটা স্কুলে পড়তাম। ফ্যাটিমা কলেজ থেকে এক মাইল দূরে ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর একটা কৃষি খামারে বাবা কাজ করতেন। কলেজ থেকে আমি সেখানে যেতাম, বাবার জন্য অপেক্ষা করতাম। রাস্তার ওপারে, পাহাড়ের ওপর একটা বাড়িতে নানা রকম ফলের গাছ ছিল। আমি চুপিচুপি সেখানে চলে যেতাম, চুরি করে আম, আনারস খেতাম।

গল্পটা একটু ‘ফাস্ট ফরওয়ার্ড’ করি। ১৯৯৪ সাল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে এক ইনিংসে আমি ৩৭৫ রান করেছিলাম। ফ্রেজার, ক্যাডিকসহ অন্য ইংরেজ বোলারদের ধন্যবাদ দিতেই হয়! তো সেই ম্যাচের পর প্রধানমন্ত্রী আমাকে একটা বাড়ি উপহার দিতে চাইলেন। আমার এক বন্ধু বলল, ‘চলো, বাড়িটা দেখে আসি।’ আমি তার গাড়িতে চড়ে বসলাম। একটা পাহাড়ি পথ ধরে গাড়ি ছুটল। আমি বললাম, ‘আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?’ বন্ধু বলল, ‘বাড়িটা সামনেই।’ আমি বললাম, ‘এই পথ তো আমার চেনা! এই বাড়ি থেকেই ছোটবেলায় আমি আম-আনারস চুরি করে খেতাম।’ শেষ পর্যন্ত সরকার থেকে আমাকে বাড়িটা দেওয়া হলো। অদ্ভুত, ১২ বছর বয়সে আমি আমার বাড়ি থেকেই চুরি করে খেতাম!

ক্রিকেট আমাকে অনেক দিয়েছে। আমার জীবনে ক্রিকেটের শুরু হয়েছিল ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর একটা ছোট্ট গ্রামে। আমরা সাত ভাই, চার বোন। ১১ ভাইবোনের মধ্যে আমার অবস্থান দশম। বুঝতেই পারছেন, পরিবারের সদস্যসংখ্যাই একটা ক্রিকেট দল গঠন করার জন্য যথেষ্ট ছিল। অতএব, পারিবারিক ম্যাচের মধ্য দিয়ে আমার ক্রিকেট খেলার হাতেখড়ি। বয়সের বিচারে আমাকে ১০ নম্বরে ব্যাট করতে হতো। প্রথমে ব্যাট করতেন বড় ছয় ভাই। মারলিন, অ্যাগনেস আর ক্যাটলিন—তিন বড় বোনও আমার আগে ব্যাট করত। তাদের বক্তব্য সোজাসাপ্টা—পৃথিবীতে আমরা আগে এসেছি, অতএব আমরা আগে ব্যাট করব! বড় ভাই গাছের ডাল কেটে একটা ব্যাট বানিয়ে দিয়েছিলেন। চার বছর বয়সে পাওয়া সেই ব্যাটটাই আমার জীবনের প্রথম ব্যাট।

ক্রিকেট ভীষণ ভালোবাসতাম। ফুটবলও খেলতাম। এমনকি ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর ছোটদের ফুটবল দলেও খেলেছি। বাবা ক্রিকেটপাগল ছিলেন। তিনি কখনোই তাঁর ইচ্ছা আমার ওপর চাপিয়ে দেননি। তবে মনে আছে, একবার সরাসরি না বলেও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, আমার কাছে তিনি কী চান। ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল দল একবার ভেনেজুয়েলায় যাচ্ছিল। অন্যদিকে হার্ভার্ড কোচিং ক্লিনিক (যেখানে ব্রায়ান লারা ক্রিকেট খেলা শিখতেন—বি. স.) তখন বার্বাডোজে যাচ্ছিল ক্রিকেট খেলতে। বাবা বললেন, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ আমি বললাম, ‘অবশ্যই ভেনেজুয়েলায়।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমার ইচ্ছে। তা খেলার সব সরঞ্জাম তোমার আছে?’ বললাম, ‘না।’ বাবা বললেন, ‘যদি তোমার একটা ক্রিকেট ব্যাট দরকার হয় তো বোলো। এ ছাড়া আর কিছু শুনতে চাই না।’ সুতরাং, একটা ব্যাটের লোভে আমাকে বার্বাডোজেই যেতে হলো। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকানো হয়নি। বুড়ো লোকটা বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর বাকি ছয় ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না (হাসি)। তা ছাড়া মেয়েদের ক্রিকেট তখন এতটা জনপ্রিয় ছিল না। একজন তরুণ ক্রিকেটার তৈরি করার সুযোগ বাবা হাতছাড়া করতে চাননি।

প্রথম যেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলার…না ভুল বললাম, খেলার সুযোগ তখনো হয়নি, তবে প্রথম যেবার আমি ওয়েস্ট ইন্ডিজের একজন ক্রিকেটারের মর্যাদা পেলাম, সেই দিনটার কথা মনে আছে। ১৯৮৯ সাল। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। অনূর্ধ্ব-২৩ টুর্নামেন্টে ভারতের বিপক্ষে বেশ ভালো খেললাম। আমার বয়স তখন মাত্র ১৯। খেলার পাশাপাশি একটা দোকানে কাজ করতাম। একদিন আমার এক সহকর্মী ফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার বাবা কথা বলতে চান।’ ফোনের ওপাশে বাবা চিৎকার করে কী যে বলছিলেন, প্রথমে বুঝতেই পারিনি। খানিকটা ধাতস্থ হয়ে তিনি বললেন, ‘তুমি কি দলের খবর শুনেছ?’ আমি বললাম, ‘কোন দল! কিসের দল!’ তিনি আবারও বললেন, ‘তুমি দলের কথা শোনোনি?’ আবারও বললাম, ‘কিসের দল?’ বাবা বললেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল।’ বললাম, ‘না, শুনিনি তো।’ বাবা বললেন, ‘তুমি দলে আছ!’

বিশ্বাস হচ্ছিল না, আমার বুড়ো বাবার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। সান্তা ক্রুজে ফিরে দেখি, বাবা তাঁর বন্ধুদের নিয়ে পার্টি শুরু করেছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরের টেস্ট ম্যাচ ছিল ত্রিনিদাদে, ভারতের বিপক্ষে। জাতীয় দলের হয়ে প্রথম খেলা, তা-ও আমার ঘরের মাঠে! পুরো দল মাঠে পৌঁছার আগেই আমি মাঠে পৌঁছে গেলাম, অনুশীলন শুরু করে দিলাম। এমন সময় বাসটা পৌঁছাল। বাসে যাঁরা বসে ছিলেন, তাঁরা সবাই আমার আইডল! তাঁদের টিভিতে দেখেছি, রেডিওতে তাঁদের কথা শুনেছি, কখনো ভাবিনি দেখা হবে। ভিভ রিচার্ডস, গর্ডন গ্রিনিচ, ডেসমন্ড হেইনেসরা যখন একে একে বাস থেকে নামতে শুরু করলেন, আমার হাত-পা রীতিমতো জমে গেল। বুঝতে পারছিলাম না, আমার কি বাসের দিকে যাওয়া উচিত, নাকি ড্রেসিংরুমের দিকে। যখন পুরো দল ড্রেসিংরুমে গেল, আমিও পা বাড়ালাম। ভাবলাম যাই, ‘হ্যালো’ বলে আসি।

ড্রেসিংরুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমার ক্রিকেট ব্যাগটা উড়ে এসে আমার পায়ের কাছে পড়ল। বুঝলাম না, কী অপরাধ আমার। দেখলাম, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর হয়ে খেলার সময় এতকাল আমি যেখানে বসেছি, ঠিক সেই জায়গাটা দখল করেছেন ভিভ রিচার্ডস। অতএব, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ দিনে আমার জায়গা হলো বাথরুমের পাশে। খেলোয়াড়েরা গোসল করতে আসত। আমাকে আমার ব্যাগটা একবার ডানে, একবার বাঁয়ে সরিয়ে রাখতে হতো। সেই ম্যাচে চূড়ান্ত একাদশে আমার জায়গা হয়নি। এদিকে বাবা এসেছিলেন কয়েকটা টিকিটের আশায়। ম্যানেজার ক্লাইভ লয়েডকে বলে বাবার বন্ধুদের জন্য কয়েকটা টিকিটের ব্যবস্থা করে দিলাম। ‘কাল দেখা হবে,’ বলে বাবার কাছে বিদায় নিয়ে টিম হোটেলে উঠলাম।

১৯৯৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই বিখ্যাত ৩৭৫ রানের ইনিংসের পর ব্রায়ান লারা

হোটেলে আমার রুমমেট যে ছিল, তার নাম আমি বলব না। সে বলল, ‘ব্রায়ান, আমি একটু নিরিবিলি সময় কাটাতে চাই। তুমি একটু কোথাও থেকে ঘুরে আসো।’ এই কথার মানে আমি জানতাম। অতএব, রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। কিছুক্ষণ পর ফোন করে বললাম, ‘আমি কি আসব?’ সে বলল, ‘না। বারবার ফোন কোরো না। আমার কাজ শেষ হলে আমিই তোমাকে ডাকব।’ অপেক্ষা করতে করতে রাত প্রায় ১১টা বেজে গেল। তখন রাত ১০টার মধ্যে রুমে ফেরার নিয়ম ছিল। সিনিয়র খেলোয়াড়েরা চাইলে হোটেলের বাইরে থাকতে পারতেন। জুনিয়রদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য কি না, আমি জানতাম না। তবু একটু পর রুমমেটকে ফোন করে বললাম, ‘আমি বরং বাড়ি যাই। সকালে ফিরব।’ সে সানন্দে রাজি হলো।

আমি বাড়ি যাইনি। বন্ধুর বাসায় ছিলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে সে রাতেই হার্ট অ্যাটাকে আমার বাবা মারা যান। ভাইয়েরা যখন হোটেলে আমাকে খুঁজতে এসেছিল, ক্লাইভ লয়েড বলেছিলেন আমি বিছানায় আছি। কিন্তু আমাকে সেখানে পাওয়া গেল না। এরপর আমাকে খুঁজে বের করতে ভাইদের খানিকটা সময় লেগেছিল।

তখনকার দিনে টেস্ট ক্রিকেটে ‘রেস্ট ডে’ বলে একটা দিন ছিল। আমার পরিবার ঠিক করল, সেদিনই বাবার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান হবে। যে মানুষটা তাঁর জীবনের সবটুকু দিয়ে ১১ ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছেন, তাঁকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে সেদিন সান্তা ক্রুজের ছোট্ট গ্রামটাতে হাজির হয়েছিল পুরো ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। স্যার ভিভ রিচার্ডসসহ পুরো দল যেই ব্লেজার পরে ছিল, সেই একই ব্লেজার ছিল আমার গায়ে। আজ আমি যা, পুরোটাই বাবার অবদান।