ঝরে পড়ার হার বেশি হলেও টিকে থাকা স্টার্টআপগুলো ভালো করছে

অর্থনীতি ই-কমার্স প্রধান খবর ফ্রিল্যান্সিং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

গত ৪-৫ বছরে দেশে সাড়ে ছয় থেকে ৭ হাজার প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ (নতুন উদ্যোগ) চালু হয়েছে। কিন্তু সফল স্টার্টআপের সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনা। গবেষকরা বলছেন, সফল হয়েছে এমন স্টার্টআপের সংখ্যা ১০-১৫টির বেশি হবে না।

সফল না হওয়া বা টিকে না থাকার পেছনে নতুন নতুন খাত তৈরি হওয়া,বারবার বিষয়ের পরিবর্তন, একটায় সফল না হলে অন্যটায় দ্রুত প্রবেশ ইত্যাদি কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তবে আশার কথা, যারা টিকে যাচ্ছে তাদের সংখ্যা হাতে গোনা হলেও তারা উদাহরণও তৈরি করতে পারছেন। নবীন উদ্যোক্তাদের সামনে তারা ‘আদর্শ’ হতে পারছেন। এটা ধরে রাখতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপগুলোর উদ্যোক্তারা।

সম্প্রতি দেশের প্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রেনিউর ল্যাব দেশের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম স্টাডি-২০১৭’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের উপাদানগুলোকে ভাগ করা হয়েছে কমিউনিটি, ইভেন্টস, কো-ওয়ার্কিং স্পেস, ভেঞ্চার ক্যাপিটালস ও অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর গ্রুপে।

প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর মধ্যে ভালো করছে বিকাশ, নিউজ ক্রেড, বিডিজবস, চালডাল, সহজ ডটকম, প্রিয়ডটকম, শিউর ক্যাশ, ডক্টরোলা, চলোডটকম, বিডিক্যাবস, বাগডুমডটকমসহ এরকম আরও কিছু প্রতিষ্ঠান।

প্রতিযোগিতা ও মেন্টরিংয়ের মাধ্যমে বের হয়ে আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভালো করছে সেবা ডপ এক্সওয়াইজেড, হ্যান্ডিমামা ও জলপাই ইলেক্ট্রনিকস।

প্রেনিউর ল্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজার গবেষণার অভাব, পণ্য বা সেবা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় শুরুতেই ব্যর্থতা, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকা, মেধাস্বত্ত্ব জ্ঞান সম্পর্কে অসচেতনতা,আইনি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান না থাকা, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী বাড়াতে যথাযথ পেপার ওয়ার্কের অভাব, একসেস টু ফাইন্যান্স, মানবসম্পদের অভাব, অর্থের সুপ্রবাহ, ক্রেতার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং মেন্টরশিপের অভাবের মতো সমস্যা মোকাবিলা করে টিকে আছে স্টার্টআপগুলো।

একই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, স্টার্টআপগুলো বাংলাদেশ থেকে সস্তা শ্রম, গণমাধ্যমের সুদৃষ্টি, একেবারে নতুন বাজার, মোবাইলফোন ব্যবহারকারী (১৪ কোটি) এবং তহবিল পাচ্ছে।

প্রেনিউর ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান আরিফ নিজামী বলেন, ‘এই স্টাডি রিপোর্ট থেকে দেশের স্টার্টআপগুলোর সামগ্রিক একটা চিত্র পাওয়া যায়। আরিফ নিজামির দাবি, স্টার্টআপ গড়ে তুলতে পুঁজি কোনও সমস্যা নয়, প্রয়োজন ইউনিক একটি আইডিয়া।’

জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানান , নতুন উদ্যোগ তৈরিতে আমাদের তরুণরা অনেক ভালো করছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আমাদের দেশ থেকেই গুগল, ফেসবুকের মতো স্টার্টআপের জন্ম হবে। তিনি আরও বলেন, স্টার্টআপ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা, ইনোভেশন ফান্ডের ব্যবস্থা, নির্বাচিত উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিতে সহায়তা দেওয়া, হাইটেক পার্কে স্টার্টআপগুলোর জন্য জায়গা বরাদ্দসহ বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

তিনি জানান,এসব খাতে যেসব ছোটখাটো সমস্যা রয়েছে সেগুলো বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে। সরকারি উদ্যোগে দেশে নির্মিতব্য ১২টি হাইটেক পার্কে বিভিন্ন (স্টার্টআপ) প্রতিযোগিতার বিজয়ী স্টার্টআপগুলোর জন্য জায়গা বরাদ্দসহ নানা আয়োজন রাখা হয়েছে।

পলক বলেন, বাংলাদেশে একটি স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরিতে তিন স্তরের একটি পিরামিড স্ট্রাকচার নিয়ে চিন্তা করছি, যার ওপরে থাকবেন উদ্ভাবকরা। এর পরে থাকবেন অ্যাচিভাররা, যারা আইটি বা আইটিএস-এ গ্র্যাজুয়েশন করে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী বা প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হবেন। তাদের সে মেধার পরিচর্যা করতে সরকার সহযোগিতা করবে। সবশেষে থাকবে আমাদের ফ্রিল্যান্সিং খাতসহ অন্যান্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং এ খাতকে এগিয়ে নিতে ছোট ছোট উদ্যোগের সঙ্গে জড়িতরা।এভাবেই দেশে একটি অনন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করতে কাজ করছি আমরা।

দেশীয় একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটালের (বিডি ভেঞ্চার) ফান্ডিংয়ে ভালো করেছে ব্রেইন স্টেশন ২৩, এসো শিখি, ইয়ন ফুডস ও সাসটেইনেবল পাওয়ার নামের কয়েকটি উদ্যোগ। জানা যায়, স্টার্টআপে বিনিয়োগ করছে ভেঞ্চার ক্যাপিটালগুলো। দেশে রয়েছে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৯টি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) প্রতিষ্ঠান। দেশীয় ভেঞ্চার কোম্পানি বিডি ভেঞ্চার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত হোসেন বলেন, ভিসিরা অর্থ বিনিয়োগ করেন ওই প্রতিষ্ঠানের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ শেয়ারের মালিক হন। আমরা কোনও উদ্যোগে বিনিয়োগের আগে সেই উদ্যোগের মধ্যে সফল হওয়ার সম্ভাবনা, প্রতিশ্রুতি, বাস্তব সমস্যা সমাধানের পথ এসব রয়েছে কিনা তা যাচাই করে দেখি।

বেসিসের সাবেক সভাপতি ও ফেনক্স ভেঞ্চার ক্যাপিটালের জেনারেল পার্টনার শামীম আহসান বলেন, অ্যামাজন, আলীবাবা এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় যেভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে তার ঢেউ আমাদের এখানেও আসবে। তাদের এই ভয়ংকর প্রতিযোগিতা আগ্রাসন হিসেবে আমাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষতি কাটানোর মতো প্রস্তুতি আমাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই। তিনি আরও বলেন, অ্যামাজন যেভাবে ব্যবসা করছে, আলীবাবা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে ১৫ বছর ধরে ব্যবসা করছে তা অকল্পনীয়।

শামীম আহসান জানান, ছোট ছোট স্টার্টআপ হচ্ছে কিন্তু টিকছে কয়টা। কিছুদিন আগে দেশে কলসেন্টারের ঢেউ উঠেছিল, এরপরে এলো বিপিও। এখন স্টার্টআপ। এই সংস্কৃতিটা বন্ধ হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী বিজনেস ম্যাগাজিন ফোর্বসের একটি প্রতিবেদনে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশের স্টার্টআপ ডক্টরোলা। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ৮টি সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ নিয়ে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আবদুল মতিন ইমন বলেন, আমাদের অনেকেরই ধারণা দেশীয় কোনও স্টার্টআপের বৈশ্বিক পর্যায়ে জায়গা করে নেওয়া খুব কঠিন। ফলে এই তালিকাটা আমাদের পথ দেখায় যে গ্লোবাল লেভেলে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। এই জায়গা করে নেওয়া পেছনে ইনোভেটিভনেস ও এক্সিকিউশনে একটা প্রতিফলন ফোর্বস দেখতে পেয়েছে।

দেশীয় উদ্যোগ চলোর প্রধান নির্বাহী দেওয়ান শুভ বলেন, আমাদের মার্কেট আছে, কিন্তু স্টার্টআপে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা তেমন একটা চোখে পড়ছে না। পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে স্টার্টআপের ঝরে যাওয়ার হার এতো বেশি হতো না।

যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অ্যালাইন স্টেইন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্টার্টআপ নিয়ে কাজ করেছেন। এখনও তিনি এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন। ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলা ট্রিবিউন যোগাযোগ করলে দেশের স্টার্টআপ সংস্কৃতি, বিকাশ, কেন সফল হচ্ছে উদ্যোগগুলো―এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন।

অ্যালাইন স্টেইন বলেন, ২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আসার পর থেকে এই দেশ সম্পর্কে জানছি। আমাকে এখানকার মানুষের যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে তা হলো তাদের কর্মস্পৃহা এবং হার না মানা মনোভাব। অনেক সংগ্রাম ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেলেও এসব ছাপিয়ে নতুন জায়গায় যেতে চায় এই দেশের মানুষ।উদ্যোক্তাদের মধ্যেও আমি দারুণ কর্মস্পৃহা দেখেছি। তাদের নতুন কিছু করার জেদ রয়েছে। তারা বুঝতে পারছে স্থানীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ আছে। বর্তমানে উদ্যোক্তারা অসংখ্য নতুন উদ্ভাবন নিয়ে হাজির হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও আমার মনে হতো, যেখানে তরুণদের চিন্তাই হলো পড়ালেখা শেষে চাকরি নিয়ে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া, সেখানে উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তাটা বিলাসিতার মতো। তবে এখন আমার এই ধারণা পাল্টেছে। এক কথায় অসম্ভব ভালো করছে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। তারা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং এটা চলমান থাকবে। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারছে সারা বিশ্ব, ভবিষ্যতে তারা আরও বুঝবে।

এক প্রশ্নের জবাবে অ্যালাইন স্টেইন বলেন,সব ভালো উদ্যোগই সফল হয় না―এই কথাটি কারও অজানা নয়। উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে ঠিকই, তবে অনেক উদ্যোগ অবিশ্বাস্য সফলতা পাচ্ছে। যে কোনও উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ। আর এসব উদ্যোগের মূলভিত্তি হলো উদ্ভাবন। ঝুঁকি নিতে হবে, মানুষের সামনে নতুন কিছু নিয়ে আসতে হবে এবং এভাবে নিজের উদ্যোগ মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলে কিনা তা দেখতে হবে। যদি মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায় তাহলে সেই উদ্যোক্তা অবিশ্বাস্য সফলতা পেতে পারেন। আর জনপ্রিয়তা না পেলে তাকে নতুনভাবে কাজ শুরু করতে হবে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে অসংখ্য নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। এমনকি অনেকে সেটা করছেও।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সামনে দারুণ সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। বিশেষ করে এই অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটাই মনে হচ্ছে। তরুণরা উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। এদের মধ্যে যারা সফল হচ্ছে তারা সমাজে কাজ করছে রোল মডেল হিসেবে। অন্য তরুণরা তাকে অনুসরণ করে উদ্যোক্তা হতে চাইছে। ফলে উদ্যোক্তা হওয়ার এক ধরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকেই সফল হয়েছে এবং তারা সমাজে রোল মডেল হিসেবে কাজ করছে। আর এমন সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। ফলে তরুণরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে।

ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক আরও বলেন, আপনি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বললেই দেখবেন,তারা হয়তো বলছে তাদের আরও আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এটা যেকোনও ব্যাংক কিংবা সরকার থেকেও হতে পারে। হয়তো তাদের এ ধরনের দাবি খুব যুক্তিসংগত। বিভিন্ন উদ্যোক্তা বিশেষ করে নারীদের জন্য আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টি এখনও সহজ হয়ে ওঠেনি। এসব বিষয় পরিবর্তন হওয়া দরকার। অবশ্য এরইমধ্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ট্যাক্সের বিষয়তো রয়েছেই। ট্যাক্স সম্পর্কিত নীতিমালা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়ক হওয়া উচিত। সবকিছু মিলিয়ে আমি মনে করি, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য বাংলাদেশ একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।