ট্রাম্পবিরোধী ঢেউ উঠছে যুক্তরাষ্ট্রে

আন্তর্জাতিক প্রধান খবর

‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’, আমেরিকাকে আবার মহান করো। এই স্লোগান নিয়ে এক বছর আগে সব পরিচিত হিসাব উল্টে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩০ লাখ ভোট কম পেয়েও জিতে গিয়েছিলেন শুধু ইলেকটোরাল ভোটের ব্যবধানে। কেন, কীভাবে জিতেছিলেন, সে তর্ক এখনো চলছে।

তবে একটা বিষয় পরিষ্কার: ২০১৬ সালের নির্বাচনে আগের তুলনায় অনেক কম ভোট পড়েছে, ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থকেরা প্রত্যাশিত সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে যাননি, ট্রাম্পের বিজয়ের সেটাই প্রধান কারণ। ২০১২ সালে যেখানে প্রায় ৬২ শতাংশ ভোটার ভোট দেন, সেখানে ২০১৬ সালে ভোট দেন মাত্র ৫৬ শতাংশ ভোটার। ডেমোক্র্যাটরা যদি উইসকনসিন, মিশিগান, নর্থ ক্যারোলাইনা ও পেনসিলভানিয়ায় মাত্র কয়েক হাজার বেশি ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে আনতে সক্ষম হতেন, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল উল্টে যেত। পিউ রিসার্চ সেন্টারের হিসাব অনুসারে, মাত্র ২৬ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।

মাত্র এক বছর যেতে না-যেতেই ভোটের এই মানচিত্র বদলে যাওয়া শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার ভার্জিনিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের আধা ডজন অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল থেকে স্পষ্ট, মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়া সত্ত্বেও এতে রেকর্ড পরিমাণ ভোটার ভোট দিতে গেছেন। আর তাঁদের অধিকাংশই ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে শুধু যে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীরা জিতেছেন তা-ই নয়, রেকর্ড পরিমাণ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। এমন নয় 
যে মধ্যবর্তী নির্বাচন ভেবে রিপাবলিকানরা ঘরে বসে থেকেছেন। বস্তুত ভোট শেষের জরিপ (একজিট পোল) থেকে স্পষ্ট, গত নির্বাচনে ট্রাম্প যে পরিমাণ ভোট পেয়েছিলেন, এবারও রিপাবলিকান প্রার্থীরা সেই পরিমাণ ভোটই পেয়েছেন। তবে ফারাকটা এই যে ডেমোক্রেটিক ভোটারদের অংশগ্রহণ গত নির্বাচনের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ভার্জিনিয়ার গভর্নর পদে র‍্যালফ নর্থাম যে প্রায় ৯ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে জিতলেন, তার কারণ একটাই: অনেক বেশি ভোটার এবার দল বেঁধে এসেছেন গতবারের ভুলটা শোধরাতে।

মোট সংখ্যার হিসাবে শ্বেতাঙ্গ ভোটার বাড়ছে না, কিন্তু আমেরিকার জনসংখ্যার গঠনগত পরিবর্তনের কারণে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সমর্থন বাড়ছে। এর কারণ নতুন ভোটারদের অধিকাংশই অভিবাসী ও সংখ্যালঘু, যাঁরা প্রায় সবাই ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট কী পরিমাণ বেড়েছে, শুধু ভার্জিনিয়ার শহরতলি লুডলুন কাউন্টির ভোটের হিসাব থেকেই তা স্পষ্ট হয়। চার বছর আগে, গভর্নর পদে লুডলুন কাউন্টিতে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী টেরি ম্যাকোলিফ পেয়েছিলেন মোট ভোটের ৪৯ শতাংশ। আর এবার নর্থাম পেয়েছেন ৬০ শতাংশ। একই ঘটনা প্রিন্স উইলিয়ামস কাউন্টিতে, সেখানেও ম্যাকোলিফের তুলনায় নর্থাম প্রায় ৯ শতাংশ বা ১৬ হাজার ভোট বেশি পেয়েছেন। এসব ভোটারের এক উল্লেখযোগ্য অংশ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বিরোধিতা করতেই তাঁরা দল বেঁধে ভোট দিতে এসেছেন। এই নতুন ভোটারদের মধ্যে রয়েছেন শহর অথবা শহরতলি থেকে আসা শ্বেতাঙ্গ ও শিক্ষিত মানুষ। ২০১৬ সালে তাঁদের অনেকেই ছিলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের পক্ষে, হিলারি তাঁদের অনুপ্রাণিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এবার তাঁরা নর্থাম দ্বারা অনুপ্রাণিত হননি, ট্রাম্পের প্রতি বিরোধিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

একাধিক জনমত জরিপ থেকে এ কথার প্রমাণ মিলেছে। এই মুহূর্তে সারা দেশে ট্রাম্পের পক্ষে জনসমর্থনের হার ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে তাঁকে সমর্থন করেন না এমন মানুষের হার ৫৮ শতাংশ। ভার্জিনিয়ায় ট্রাম্পকে ‘প্রবলভাবে অপছন্দ’ করেন এমন মানুষ ৪৭ শতাংশ। আর এসব ভোটারের ৯৫ শতাংশই ভোট দিয়েছেন ডেমোক্রেটিক বাক্সে। লুডলুন কাউন্টির একজন ভোটার আমেরিকার রাজনৈতিক সাংবাদিকতা-বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘পলিটিকো’কে জানিয়েছেন, ব্যালট পেপারে একজন অদৃশ্য মানুষের নাম ছিল, তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প।

২০১৬ সালে ট্রাম্পের সাফল্যের কারণ ছিল তিনি গ্রামীণ ও কম শিক্ষিত ভোটার ছাড়াও শহরতলির শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের কাছে টানতে সক্ষম হয়েছিলেন অভিবাসন, কৃষ্ণাঙ্গ ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে। ‘মেক আমেরিকান গ্রেট এগেইন’ স্লোগানটিই ছিল প্রবল বর্ণবাদী। আমেরিকার ৩০-৩৫ শতাংশ মানুষ যাঁরা এখনো ট্রাম্পের পক্ষে, তাঁদের অধিকাংশই হয়তো এই স্লোগানে বিশ্বাস করেন। তাঁরা বদলাননি, হয়তো বদলাবেনও না। কিন্তু শুধু ৩৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে সাধারণ নির্বাচনে জেতা সম্ভব নয়। এমনকি এই শ্বেতাঙ্গদের কাছেও ট্রাম্পের আবেদন ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। গত মঙ্গলবারের নির্বাচনী ফলাফল থেকেই সে কথা স্পষ্ট। রিপাবলিকান প্রার্থী এড গিলেস্পি ট্রাম্পের ‘নির্বাচনী খেলার বই’ থেকে প্রতিটি পাঠ অনুকরণ করেছিলেন। তিনি সংখ্যালঘু, বিশেষত কৃষ্ণাঙ্গদের খুনে ও মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে প্রচার করেছেন। শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের দলে টানতে দাসপ্রথার সমর্থকদের মনুমেন্ট ভাঙার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। খ্রিষ্টান মূল্যবোধের কথা বলে সমকামী বিবাহের বিরোধিতা করেছেন। এর কোনোটাই কাজে লাগেনি।

শুধু ভার্জিনিয়া নয়, মঙ্গলবার আমেরিকার যেখানেই ভোট হয়েছে, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বত্রই ডেমোক্র্যাটদের বিজয় হয়েছে। অভাবিত সব প্রার্থী বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। নিউ জার্সিতে এই প্রথম একজন শিখ মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, অথচ এখানে ট্রাম্পের সমর্থকেরা ‘বিদেশি খেদাও’ দাবি তুলে প্রচারপত্র বিলি করেছেন। শ্বেতাঙ্গ-প্রধান মন্টানার একটি শহরে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন একজন লাইবেরীয় উদ্বাস্তু। ভার্জিনিয়ায় এই প্রথম একজন লিঙ্গান্তরিত তরুণী আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এমন একজন রিপাবলিকানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যিনি নিজেকে ‘সমকামীদের এক নম্বর বিরোধী’ পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। এই ভার্জিনিয়াতেই ট্রাম্পের কট্টর এক সমর্থককে হারিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন পেরুর এক অভিবাসী।

এই নির্বাচনে যত না ডেমোক্রেটিক সমর্থন ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল ট্রাম্প ও রিপাবলিকান বিরোধিতা। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা লিখেছে, ঝড়-বাদল উপেক্ষা করে মানুষ ভোট দিতে এসেছেন শুধু ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিজের মতামত জানাতে। ‘ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয়ের প্রথম বার্ষিকীতে ভোটাররা জানিয়ে দিলেন, তাঁরা আর ট্রাম্পকে চান না।’ একজন রিপাবলিকান নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ যা বলেছেন বাংলায় তা দাঁড়ায়, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কলাগাছ দাঁড় করালেও এবার সে জিতে যেত।

এই ভোটের ফলাফল দেখে মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী ঢেউ উঠছে। ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ এই ট্রাম্পবিরোধী ঢেউকে কাজে লাগিয়ে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া। কাজটা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। এ জন্য তাঁদের প্রয়োজন ২৪টি অতিরিক্ত আসন। এই মুহূর্তে রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটরা গড়পড়তা ১০ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে। ট্রাম্পবিরোধী ঢেউয়ের দাবি যদি সত্য হয়, আর জনমতের এই ব্যবধান যদি ধরে রাখা যায়, তাহলে ২৪ আসনের এই ফারাক অতিক্রম অসম্ভব হবে না। এ কাজে ডেমোক্র্যাটদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন খোদ রিপাবলিকানরাই। দুই ডজনের মতো রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য জানিয়েছেন, ২০১৮ সালে তাঁরা পুনর্নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তাঁদের হিসাবে ধরে ২০১৮ সালের যে নির্বাচনী মডেল তৈরি হয়েছে, তাতে এই মুহূর্তে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে রাখা ৬০টি আসনে ডেমোক্র্যাটরা সামান্য ব্যবধানে হলেও এগিয়ে রয়েছেন।

২০১৮ সালের নির্বাচন এখনো দূরে। আগামী এক বছরে নানাভাবে এই হিসাবের পুরোটাই বদলে যেতে পারে। অথবা তার আগে রাশিয়ার সঙ্গে আঁতাতের কারণে ট্রাম্প নিজেই ফেঁসে যেতে পারেন। কিন্তু আপাতত ডেমোক্র্যাটরা এই দুইয়ের কোনোটাতেই আগ্রহী নন। মঙ্গলবারের নির্বাচনে তাঁরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যেভাবে নকআউটে ধরাশায়ী করলেন, এই মুহূর্তে তার জন্য আরও এক বোতল শ্যাম্পেন খুলতেই তাঁরা অধিক ব্যস্ত।