ঢাকায় বিদেশিদের দৌড়ঝাঁপ

আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ

গত মাসেই ঢাকায় ঘুরে গেলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। চলতি মাসের প্রথম সপ্তায় এসেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি টমাস এ শ্যানন। এ মুহূর্তে ঢাকায় আছেন চীন, জাপান, জার্মানি ও সুইডেনের মতো চারটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এই চারটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একই সময়ে ঢাকা সফরকে যদিও উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু, কিন্তু পর্দার অন্তরালে অনেক কিছু নিয়েই আলোচনা চলছে বলে জানাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক জটিল পর্যায় অতিক্রম করছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি। এখন আরেকটি নির্বাচন ঘনিয়ে এসেছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী বছরের শেষের দিকে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে নির্বাচন এগিয়ে আসারও সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে বলে সরকারের সূত্রগুলো থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আর একে কেন্দ্র করেই বিদেশিদের এতো আনাগোনা চলছে।
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে জাতীয় নির্বাচনের সংলাপ শেষ করেছে। এখন সুপারিশ তৈরির কাজ চলছে। নির্বাচন কমিশনের নিজেদের মধ্যে মতদ্বৈধতা থাকার কারণে সুপারিশ তৈরিতে বিলম্ব হচ্ছে, এমন খবর ইতিমধ্যেই চাউর হয়েছে। বিদেশিরা আলাদা আলাদাভাবে কয়েক দফায় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় বলে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে দিয়েছেন।
গতকাল সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন চীন, জাপান, সুইডেন ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এদিকে একই সময়ে ঢাকা সফরে এসেছে মার্কিন সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের একটি প্রতিনিধি দলও। আজ ভোরে এসে পৌঁছেছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত ইইউ হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ। জাপান, সুইডেন ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইইউ প্রতিনিধিকে নিয়ে আজ একসঙ্গে কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
জানা গেছে, এ সময়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ঢাকায় অবস্থান করলেও তিনি কক্সবাজার পরিদর্শনে যাবেন না। অন্যদিকে গতকাল দুপুরের আগে ঢাকা পৌঁছানোর পর সরাসরি কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেন দুই মার্কিন সিনেটর জেফ মার্কলে ও রিচার্ড ডারবিনের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের মার্কিন প্রতিনিধি দল। এই দলে আছেন আরও তিন কংগ্রেসম্যান এবং চারজন স্টাফার।
বিদেশিদের এসব তৎপরতাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা শুধুমাত্র রোহিঙ্গা সংকটের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছেন না। তারা মনে করছেন, এর মূলে রয়েছে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট। এটা নতুন কথা নয়, অতীতে যখনই বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে, বিদেশিদের তৎপরতা বেড়েছে। তবে এবারকার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন রকমের।
গত ১ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ সফরে আসা মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সফরের সমাপনী দিনে ৪ নভেম্বর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীকরণ এবং নেতৃত্ব নির্বাচনের অবাধ সুযোগ ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলেন তারা।
গত ৬ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি টমাস এ শ্যানন। তিনি জানতে চান আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যাবে কিনা? নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো শর্ত আছে কি? কোন অবস্থায় তারা নির্বাচনে যেতে চায়? বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
এর আগে গত ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ সফরে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। সেদিন রাতে স্থানীয় একটি হোটেলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বৈঠক হয়। সুষমা স্বরাজ বলেন, বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক দেখতে চায় ভারত। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও মত দেন তিনি। বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশে সংস্থাটির ডেলিগেশন প্রধান ও রাষ্ট্রদূত রেনজি টিরিংক গত ১৮ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়কে ‘দেশের জন্য কঠিন সময়’ বলে আখ্যায়িত করেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সত্যিই বাংলাদেশ এখন এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি। দেশের মানুষও এ সময়টাকে সেভাবেই দেখছেন। মানুষ চিন্তিত- আগামীতে কী প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কিনা, বহুল প্রতিক্ষীত শান্তি-স্থিতিশীলতা আসবে কিনা- এসব নিয়ে।