দেশ জুড়ে মাদ্রাসার পাঠ্যবই থেকে বাদ পড়ছে ‘জিহাদ’

বাংলাদেশ শিক্ষা

স্কুলের পাঠ্যবইয়ে দেওয়া হচ্ছে জেহাদের শিক্ষা। সেই কারণে মাদ্রাসার সব বই থেকে জিহাদ সম্পর্কিত অধ্যায় বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে ধর্মবিশ্বাসীদের মনে জিহাদের বীজ বুনে দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এমনই অভিযোগ উঠছিল মাদ্রাসাগুলির বিরুদ্ধে। সেই সকল অভিযোগের নিষ্পত্তি ঘটাতেই এবার আসরে নামল বাংলাদেশ সরকার।

মাদ্রাসার পাঠ্যবইগুলোতে, ‘জিহাদ’ বলতে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বা যুদ্ধকে বোঝানো হয়েছে। মাদ্রাসার শিক্ষার সঙ্গে জড়িত রয়েছে ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। এই সকল বইয়ে উল্লেখ রয়েছে একজন ব্যক্তি মুখাবয়ব, কলম, ভূখণ্ড ও জীবিকার মাধ্যমে জিহাদের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া এসব বইয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। যদিও বইগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, বোমা বিস্ফোরণ, খুন ও ভাঙচুর সৃষ্টিকর্তার চোখে বেআইনি কাজ।

বাংলাদেশের জঙ্গি প্রতিরোধ বিষয়ক জাতীয় কমিটি মনে করছে যে মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি অধ্যায় শিক্ষার্থীদেরকে জঙ্গি হতে উদ্বুদ্ধ করে। সেই কারণে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয় মাদ্রাসা বোর্ডের কাছে। সেই চিঠিতে মাদ্রাসার পাঠ্যবই থেকে জিহাদ সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয় মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে আরও বলে হয় যে কোরান, হাদিস, সংবিধান ও জাতীয় বিষয়ে হিংসাত্মক যা কিছু রয়েছে সব বাদ দিতে হবে।

এই প্রসঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান একেএম সাইফ উল্লাহ বলেছেন, ‘জঙ্গি প্রতিরোধ বিষয়ক জাতীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কোরান-হাদিস, আরবি ও ফিকাহর ওপর পাঠ্যবইগুলো গভীরভাবে মূল্যায়নের কাজ চলছে। যেসব অধ্যায়ে বিতর্কিত বিষয় রয়েছে, বিশেষ করে জঙ্গিবাদকে উৎসাহিত করা হয় এমন বিষয় শনাক্ত করে বাদ দেওয়া হবে।’ মাদ্রাসার পাঠ্যবই পুনর্মূল্যায়নের জন্য আটটি রিভিউ কমিটি ও একটি সুপারভাইজরি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সহকারী সচিব মহম্মদ খালেক মিয়ার তরফ থেকে এই নির্দেশ জারি করা হয়। প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ১৫টি বই পুনর্মূল্যায়নের দায়িত্ব পেয়েছে কমিটিগুলো। এছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত ২০টি পাঠ্যবই পর্যালোচনা করতে হবে কমিটির সদস্যদের।

সরকারের এই উদ্যোগের বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক জুনাইদ বাবুনগরীর কথায়, ‘জিহাদ মানেই জঙ্গি কার্যক্রম নয়। তাছাড়া মাদ্রাসার সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত নয়।’ একইসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যবই পুনর্মূল্যায়নের কোনও প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করি না।’ নোয়াখালীর একটি আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ ইউসুফের কথায়, ‘জিহাদ ও জঙ্গি কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা। তাই শিক্ষার্থীদের যেন এই দুটি মতাদর্শের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে, সরকারকে এমন একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে।’ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান একেএম সাইফ উল্লাহ জানিয়েছেন যে জিহাদ সম্পর্কিত সবকিছু বাদ দেওয়া হলেও ইবাদত তথা প্রার্থনা বিষয়ক আলোচনা ঠিকই থাকছে নতুন পাঠ্যবইয়ে। এছাড়া পাঠ্যবইয়ে আর কোনও বড় পরিবর্তন আসবে না।

মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থায় জঙ্গিবাদকে উৎসাহিত করা হচ্ছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশনা বিভাগের নিয়ন্ত্রক মহম্মদ শাহজাহান। তিনি বলেছেন, ‘আমরা শুনেছি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ ধরনের অভিযোগ করেছেন। যাই হোক, যেসব বই নিয়ে প্রাথমিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে সেগুলো মাদ্রাসা বোর্ডের নয়, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এসব জাল বই প্রকাশ করেছে। যদি কোনও প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য বোর্ডের অনুমোদন না নিয়ে বই প্রকাশ করে তাহলে তার দায় তাদের, আমাদের নয়।’