ধূমপানের ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে সবাই কি সচেতন?

পরামর্শ

আমার ছোট ভাইয়ের এক বন্ধু, নাম তৌসিফ। ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাড়িতে তার আসা-যাওয়া। কয় দিন আগে খবর পেলাম, তৌসিফ আর নেই। জানতে পারি, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিল। ধরা পড়ে একবারে শেষ সময়ে, যখন আর কিছু করার ছিল না। খুব কষ্ট পাই তৌসিফের মৃত্যুর সংবাদে। বয়স মাত্র ৩১ বছর হয়েছিল। টগবগে এক তরুণের এমন অকালমৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। খুব ধূমপান করত তৌসিফ। যাকে বলে একেবারে চেইন স্মোকার। অতিরিক্ত ধূমপানের ফলেই তৌসিফ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়, যার একমাত্র পরিণতি মৃত্যু। তবে শুধু তৌসিফ নয়, দেশে আরও বহু মানুষ এভাবে ধূমপানের ফলে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। চিকিৎসকদের মতে, ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশ ধূমপান তথা তামাক সেবনের কারণে আক্রান্ত হয়। তামাকপাতা কেটে পরিশোধন করার পর তার সঙ্গে আনুষঙ্গিক কয়েকটি উপাদান মিশিয়ে তৈরি করা হয় সিগারেট। আর সেই সিগারেট পান করে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে প্রাণঘাতী ক্যানসারে।

শুধু ফুসফুসের ক্যানসারই নয়, তামাক সেবনের জোরে খাদ্যনালি, স্বরনালি, কিডনি, অগ্ন্যাশয়, জরায়ুমুখের ক্যানসারও হয়। এ ছাড়া হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ব্রঙ্কাইটিস, যক্ষ্মা, ডায়াবেটিস, অ্যাজমাসহ নানা রোগ হয়। আরেকটি ভয়াবহ রোগ হয় ধূমপানের ফলে। সেটা হচ্ছে পায়ের বার্জারস রোগ। আক্রান্ত পায়ে পচন ধরে যায়। আর এ রোগের একমাত্র চিকিৎসা হচ্ছে আক্রান্ত পা কেটে বাদ দেওয়া। বরণ করতে হয় পঙ্গুত্ব।

প্রতিবছরের ৩১ মে সারা বিশ্বে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশও দিনটি উপলক্ষে নানা সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কিন্তু বিশ্ব কি আদৌ তামাকমুক্ত হয়েছে? কিংবা আমাদের দেশের চিত্র কী?

এ বছর বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের তথ্য হচ্ছে দেশে বর্তমানে প্রায় সোয়া চার কোটি মানুষ তামাক ব্যবহার করে। তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা, অকালমৃত্যু ও পঙ্গুত্বের কারণে প্রতিবছর ক্ষতি হয় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে এ খাতে সরকারের বছরে আয় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ফলে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) তথ্যমতে, প্রতিবছর পুরুষদের পরোক্ষ ধূমপানে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন অধূমপায়ী এক কোটি নারী। অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি) নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ২০১৫ সালে এক জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন তামাক (জর্দা, গুল, সাদাপাতা) সেবনের কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশের ৫৭ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। প্রতিবছর ৪ শতাংশ নতুন ধূমপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে আর এর মধ্যে ১৫ থেকে ১৮ বছরের ধূমপায়ীর সংখ্যা বেশি। তামাকের ব্যাপক ব্যবহার এবং এর ফলে ক্ষতির পরিমাণ সত্যিই উদ্বেগজনক।

ভাবুন তো, সোয়া চার কোটি মানুষ বলতে গেলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছেন। এসব তামাক ব্যবহারকারীর সবাই কি জানেন এর ঝুঁকি সম্পর্কে? সরকার গত বছরের ১৯ মার্চ থেকে সব ধরনের তামাকজাত পণ্যের মোড়কে চিত্রসহ সতর্কবাণী দেওয়া বাধ্যমূলক করে। উদ্দেশ্য, ধূমপান বা তামাকজাত পণ্যের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা। কিন্তু গত বছরের জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৪৩ শতাংশ তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সচিত্র সতর্কবাণী এসেছে, তবে এগুলোর অধিকাংশেই আইন অনুযায়ী ছবি ব্যবহার করেনি তামাক কোম্পানিগুলো।

দেশে ধূমপায়ীর সংখ্যা বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আসলেই নেই। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সরকার ২০০৫ সালে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫’ প্রণয়ন করে। পরে আইনটিকে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন-২০১৩’ সংসদে পাস হয়। সর্বশেষ ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০১৫’ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু আইন ও বিধিমালার প্রয়োগ কোথায়? কেউ কি এসব আইন জানে? জানলেও কি মানে?

সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তামাক চাষ নিয়ে উদ্বেগজনক কিছু খবর ছাপা হয়েছে। যেমন তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষকদের লোভের ফাঁদে ফেলে তামাক চাষে উৎসাহিত করছে। অগ্রিম অর্থসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কৃষকদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে এ ক্ষতিকর চাষে। খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, নীলফামারীসহ কয়েকটি জেলায় ব্যাপকভাবে তামাকের চাষ হচ্ছে। আগে ধান ও অন্য ফসল হতো, এ রকম জমিতে এখন তামাকের চাষ হচ্ছে। তামাক চাষে আয় বেশি হওয়ায় কৃষক উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিবছর তামাকের খেত সম্প্রসারণ করছেন। আর এভাবে তামাক চাষের ফলে জমির যে ক্ষতি হচ্ছে, তা অকল্পনীয়। তামাকের বীজতলা থেকে শুরু করে তামাকপাতা তোলা বা সংগ্রহের সময় পর্যন্ত রাসায়নিক সার ও বিষ ব্যবহার করা হয়। এতে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। এসব সার ও বিষ বিলের পানিতে মেশার ফলে বিভিন্ন জাতের মাছ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মোদ্দা কথা, তামাক একটি ক্ষতিকর বস্তু। এটা মানুষ থেকে শুরু করে মাটি, ফসল ও অন্যান্য প্রাণীর জন্যও ক্ষতিকর। তামাকে সবারই ক্ষতি, লাভ শুধু তামাকজাত পণ্যের ব্যবসায়ীদের। শুধু নেশা করার জন্য একটি ক্ষতিকর জিনিস মানুষ গ্রহণ করে চলেছে, ভাবতেই অবাক লাগে।

তবে এটাও তো ঠিক যে সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল, সাদাপাতা—এগুলো খুব সহজলভ্য আমাদের দেশে। দামও নাগালের মধ্যে। হাতের কাছে নেশা উদ্রেককারী এসব বস্তু থাকবে আর মানুষ তা ব্যবহার করবে না, তাই কি হয়? বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যে আমি আপনার সামনে লোভনীয় সব খাবার রেখে দিয়ে বলব, এসব খাওয়া যাবে না, খেলে অনেক ক্ষতি হবে। কেউ কি আমার এই সাবধানবাণীতে কান দেবেন? আমার তো উচিত হবে আসলে লোভনীয় খাবারটি আপনার সামনে না রাখা। একইভাবে আইন করে ও তামাকজাত পণ্যের গায়ে সচিত্র সতর্কবাণী দিয়ে মানুষকে তামাক গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখা যাবে না। এমন তো নয় যে তামাক কোম্পানিগুলো অবৈধভাবে ব্যবসা করছে। অন্য দেশ থেকে তামাকজাত পণ্য আমদানিও হচ্ছে। তার মানে, তামাক উৎপাদন ও আমদানিতে রাষ্ট্রের সায় আছে। তামাকমুক্ত দেশ গড়তে হলে দেশে তামাকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের আমদানি বন্ধ করার দিকে যেতে হবে। হয়তো কাজটা সহজ নয়, তবে সরকারের সদিচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।