নিজের একটা গল্প তৈরি করো

প্রধান খবর ফিচার

ছোটবেলায় আমার গ্রীষ্মের ছুটি কাটত দাদাবাড়িতে। টেক্সাসে দাদার সঙ্গে তাঁর খামারবাড়িতে কাজ করতাম। যন্ত্রপাতি ঠিক করা, গবাদিপশুকে ওষুধ দেওয়াসহ আরও অনেক কাজ করতে হতো। বিকেলবেলা দেখতাম মঞ্চনাটক। বিশেষ করে ডেইজ অব আওয়ার লাইভস ছিল আমাদের প্রিয়। আমার দাদা-দাদি একটা ভ্রমণ সংগঠনের সদস্য ছিলেন। ক্যারাভ্যান নিয়ে তাঁরা ঘুরে বেড়াতেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডা অবধি। গ্রীষ্মের ছুটিতে আমিও তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতাম। এই ভ্রমণের জন্যই দাদা-দাদির ভীষণ ভক্ত ছিলাম। একবার এ রকমই একটা ভ্রমণে বেরিয়েছি। আমার বয়স তখন ১০। গাড়ির পেছনের লম্বা সিটটাতে শুয়ে ছিলাম। চালকের আসনে ছিলেন দাদা। পাশে বসে দাদি সিগারেট ফুঁকছিলেন। সিগারেটের গন্ধ আমার একেবারেই সহ্য হতো না।

ওই বয়সে আমি অঙ্ক করার সুযোগ খুঁজতাম। কত কিলোমিটারে কত টাকার গ্যাস খরচ হলো, কেনাকাটায় কত গেল—এসব অপ্রয়োজনীয় হিসাব খুব আগ্রহ নিয়ে করতাম। সে সময় একটা ধূমপানবিরোধী বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো। যত দূর মনে পড়ে, বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল—‘সিগারেটে একেকটা টান আপনার জীবন থেকে দুই মিনিট কেড়ে নিচ্ছে।’ আমি দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলাম, যে করেই হোক, দাদির জীবন থেকে কয় মিনিট চলে গেল, সেই হিসাবটা বের করব। দাদি প্রতিদিন কয়টা সিগারেট খান, একেকটা সিগারেটে কয়টা টান দেন, আমি সব হিসাব করছিলাম। হিসাবনিকাশ শেষে অবশেষে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো একটা সংখ্যা পাওয়া গেল। গাড়ির পেছনের সিট থেকে দাদির গলা জড়িয়ে ধরে আমি বললাম, ‘দাদি, তুমি কি জানো, সিগারেটের প্রতি টানে জীবন থেকে দুই মিনিট কমে যায়—এই হিসাবে তুমি তোমার আয়ু নয় বছর কমিয়ে ফেলেছ?’

স্পষ্ট মনে আছে, আমি আশা করছিলাম দাদি আমাকে বাহবা দেবেন। আমার বুদ্ধিমত্তা আর গাণিতিক দক্ষতার প্রশংসা করবেন। কিন্তু তা হলো না। দাদি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আমি হতবাক হয়ে পেছনের সিটে বসে রইলাম। শান্ত ভঙ্গিতে রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করালেন দাদা। নেমে এসে পেছনের দরজা খুলে আমার মুখোমুখি হলেন। আমি একটু ভাবনায় পড়ে গেলাম। দাদা কি আমাকে বকা দেবেন? দাদা খুবই বুদ্ধিমান, শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। ভাবছিলাম, এই প্রথম হয়তো আমি দাদার মুখ থেকে ধমক শুনতে যাচ্ছি। অথবা তিনি হয়তো আমাকে দাদির কাছে ক্ষমা চাইতে বলবেন। আসলে এ রকম অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমি আগে কখনো পড়িনি। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে দাদা বললেন, ‘জেফ, একদিন তুমি বুঝবে, একই সঙ্গে বিনীত ও বুদ্ধিমান হওয়া সহজ নয়।’

উপহার পাওয়া আর কোনো কিছু অর্জন করার মধ্যে তফাত আছে। এ সম্পর্কেই আজ আমি বলব। বুদ্ধিমত্তা একটা উপহার। কিন্তু বিনীত হওয়ার বৈশিষ্ট্য অর্জন করে নিতে হয়। উপহার পাওয়া সহজ। কিন্তু নিজের মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য আয়ত্ত করা কঠিন। যে চারিত্রিক গুণাগুণ নিয়ে তুমি জন্মেছ, চাইলে সেগুলোর অপব্যবহার করতে পারো। আবার চাইলে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করে আরও গুণ অর্জন করতে পারো।

তোমরা একেকজন একেক উপহার নিয়ে জন্মেছ। তোমরা বুদ্ধিমান, মেধাবী। মেধা না থাকলে তোমরা আজ এখানে উপস্থিত হতে পারতে না। তোমার বুদ্ধিমত্তা তখনই কাজে আসবে, যখন তুমি এই বিস্ময়কর পৃথিবী চষে বেড়াবে। মানুষ নিজেরাই নিজেকে চমকে দেয়। আমরা নবায়নযোগ্য শক্তি আবিষ্কার করছি। একেকটা অণু-পরমাণু ধরে ধরে আমরা তৈরি করছি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ, যা আমাদের শরীরের ভেতর ঢুকে রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। মাঝেমধ্যে ভাবি, জুলভার্ন, মার্ক টোয়েন, গ্যালিলিও, নিউটনের মতো কৌতূহলী মানুষেরা যদি আজকের পৃথিবীটা দেখে যেতে পারতেন! তোমাদের একেকজন একেক ‘উপহার’ নিয়ে জন্মেছ। জাতিগতভাবে আমরা সফল হব তখন, যখন এই সব উপহার আমরা একত্রে কাজে লাগাতে পারব।

কীভাবে এই উপহার তোমরা কাজে লাগাবে? কী নিয়ে তুমি গর্ব করো? উপহার, নাকি অর্জিত গুণ?

১৬ বছর বয়সে অ্যামাজন চালু করার ভাবনা আমার মাথায় আসে। লক্ষ করছিলাম, প্রতিবছর ইন্টারনেটের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি আর কোনো কিছুকেই এত দ্রুত হারে বাড়তে দেখিনি। লাখ লাখ বইয়ের একটা পাঠাগার, সেটার দৃশ্যমান কোনো অস্তিত্ব নেই—ভাবনাটা আমাকে ভীষণ রোমাঞ্চিত করছিল।

আমি আমার স্ত্রী ম্যাককেনজিকে বলছিলাম, চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি আমার ভাবনাটা নিয়ে কাজ করতে চাই। যদিও জানি, আমার উদ্যোগটা ব্যর্থও হতে পারে। অনেক উদ্যোগই মুখথুবড়ে পড়ে। আমার স্ত্রী প্রিন্সটন থেকেই স্নাতক করেছে, আজ দর্শকের আসনে বসে আছে। তো সে আমাকে বলেছিল, আমার ঝুঁকিটা নেওয়া উচিত। বাড়ির গ্যারেজ ছিল আমার আবিষ্কারের কারখানা। আমি সব সময় একজন উদ্ভাবক হতে চেয়েছি এবং আমার স্ত্রী আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

নিউইয়র্কে আমি একটা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। সহকর্মীরা স্মার্ট ছিলেন। দারুণ একজন বস পেয়েছিলাম, সেটাও স্বীকার করতেই হয়। একদিন আমি আমার বসকে বললাম, ইন্টারনেটে আমি একটা বইয়ের দোকান চালু করতে চাই। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটতে বেরোলেন। আমার পুরো ভাবনাটা শুনলেন। সব শেষে বললেন, ‘দারুণ আইডিয়া। তবে আইডিয়াটা তার জন্য আরও ভালো, যার একটা ভালো চাকরি নেই।’ যুক্তিটা আমার পছন্দ হলো। বস আমাকে বললেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার অন্তত দুই দিন বিষয়টা নিয়ে ভাবা উচিত। অনেক ভেবেচিন্তে দেখলাম, চেষ্টা করে যদি বিফল হই, তাতে আমার আফসোস থাকবে না। সঠিক সময়ে সাহস করে সিদ্ধান্তটা নিতে পারিনি—এই আফসোস অন্তত সারা জীবন বইতে চাই না। অবশেষে আমি আমার হৃদয়ের চাওয়াটাই পূরণের সিদ্ধান্ত নিলাম। আজ আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে গর্ব করি।

যখন তুমি বুড়ো হবে, তখন তোমার সিদ্ধান্তগুলোই হবে তোমার গল্প। নিজের জন্য একটা দারুণ গল্প তৈরি করো। ধন্যবাদ।