নিজের সাফল্যের পুর ক্রেডিট মাশরাফিকে উৎসর্গ করলেন আশরাফুল

ক্রিকেট খেলাধুলা

মোহাম্মদ আশরাফুলের চোখেমুখে যে উদ্বেগের ছায়া, সেটি বোঝা গেল মুঠোফোনের এ প্রান্ত থেকেও। বিকেএসপিতে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ শেষে বের হয়েছেন ঘণ্টাখানেক হলো, গাড়ি দুই কিলোমিটারও এগোতে পারেনি। যানজটে ঠাঁই দাঁড়িয়ে, কখন বাসায় পৌঁছাবেন, সেটি নিয়ে ভীষণ চিন্তিত তিনি।

বাসায় ফেরা নিয়ে চিন্তিত হলেও ফর্ম নিয়ে আপাতত উদ্বেগের কিছু নেই আশরাফুলের। এবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগটা যেন তাঁর কাছে ছিল আবার চেনানোর মঞ্চ। গতকাল বিকেএসপিতে প্রিমিয়ার লিগের অবনমন ঠেকানোর ম্যাচে অগ্রণী ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাবের বিপক্ষে ১০৩ রানে অপরাজিত ছিলেন। সেঞ্চুরি সংখ্যায় (৪টি) আশরাফুলই এবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে সবার ওপরে।

লিগের শুরুতেও সেঞ্চুরি পেলেও সেই পুরোনো রোগটা যেন পেয়ে বসেছিল আশরাফুলের। ২৪ ফেব্রুয়ারি শাইনপুকুর আর ২৮ ফেব্রুয়ারি খেলাঘরের বিপক্ষে টানা শূন্য রানে ফিরলেন। টিম ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নিল, আশরাফুলকে বিশ্রাম দেওয়া হবে। দলের কোচ জালাল আহমেদ চৌধুরীকে অনেক অনুরোধ করে ৪ মার্চ বিকেএসপিতে অগ্রণী ব্যাংকের বিপক্ষে খেললেন। সেদিন অপরাজিত রইলেন ১০২ রানে। পরের ম্যাচে আবার শূন্য রানে ফিরলেও আশরাফুল ছন্দে আর মরচে ধরতে দেননি। তাঁর সবশেষ ৬টি ইনিংস: ১০২*, ০, ৬৪, ১৬, ১২৭, ১০৩*।

২৮ ফেব্রুয়ারি খেলাঘরের ওই ম্যাচের পর থেকেই আশরাফুলের আশ্চর্য বদল। আর সেই বদলে বড় ভূমিকা আছে মাশরাফি বিন মুর্তজার। খেলাঘর-ম্যাচের দিন আশরাফুলদের ড্রেসিংরুমে এসেছিলেন বাংলাদেশ ওয়ানডে অধিনায়ক। ছন্দ হারিয়ে ফেলা আশরাফুলকে কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন। মাশরাফির সেই পরামর্শ কীভাবে ধার ফেরাল তাঁর ব্যাটে, মুঠোফোনে সেই গল্পটা বলছিলেন আশরাফুল, ‘যে চার বছর (নিষেধাজ্ঞায়) খেলার বাইরে ছিলাম, স্কিল ট্রেনিং করেছি। কিন্তু ফিটনেস নিয়ে তেমন কাজ করিনি। সত্যি বলতে খাওয়া-দাওয়ায় আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। খেলাঘরের ম্যাচের দিন ড্রেসিংরুমে মাশরাফি এসেছিল। ওর সঙ্গে গল্প করছিলাম। আমাকে নিয়ে ওর উপলব্ধি হচ্ছে, আমি ফিটনেস নিয়ে সেভাবে পরিশ্রম করিনি। ওর সঙ্গে কথা বলার পরই মনে হলো খাওয়া-দাওয়ায় নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। ফিটনেসে উন্নতি করলে স্বচ্ছন্দে ব্যাটিং করা যাবে। খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ, কঠোর পরিশ্রম এসবই কাজে দিয়েছে। আর যেহেতু জানি, খেলাটা কীভাবে খেলতে হয়; নিজের প্রতি একটা বিশ্বাস তো ছিলই।’

ফিটনেস নিয়ে বাড়তি মনোযোগের পাশাপাশি স্কিল নিয়েও আশরাফুল কঠোর পরিশ্রম করেছেন। ব্যক্তিগত এ সাফল্যে কৃতজ্ঞতা জানালেন দলের কোচিং স্টাফদেরও, ‘আশিক ভাই, আরিফ, মোরশেদ ভাই প্রচুর সহায়তা করেছেন। দিনে ৩০০-৪০০ থ্রো ডাউন করেছেন তাঁরা। ভাগ্যও সঙ্গে ছিল। ফতুল্লায় বেশির ভাগ ম্যাচেই রান পেয়েছি।’

ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স উজ্জ্বল হওয়ার পেছনে আশরাফুল যে ভাগ্যের কথা বললেন, দলীয় পারফরম্যান্সে সেটি ঠিক বিপরীত! তাঁর দল কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের অবনমন নিশ্চিত। দলকে প্রথম বিভাগে নেমে যেতে দেখে ভীষণ হতাশ আশরাফুল, ‘একা কি দল জেতানো যায়? দল নেমে গেছে, আমাদের জন্য হতাশার। গত দুই বছরে আমার দুই অভিজ্ঞতা হলো। গত মৌসুম দিয়ে দীর্ঘদিন পর ফিরলাম। কলাবাগানে খেললাম অবনমন বাঁচাতে। সুপার লিগে উঠতে পারলাম না। ক্যারিয়ারের প্রথমবারের মতো সুপার লিগ না খেলার অভিজ্ঞতা হলো আমার। আর এবার তো নেমেই গেলাম। ভাগ্য খারাপ। আমি মনে করি সঠিক একাদশ একদিনও করতে পারিনি আমরা। অধিনায়কত্বও নিয়ে প্রশ্ন আছে। আরেকটু শক্ত টিম ম্যানেজমেন্ট দরকার ছিল।’

আশরাফুল যে চারটি সেঞ্চুরি করেছেন, এর তিনটিই বিফলে গেছে। দল পারেনি জিততে। তাঁর স্ট্রাইকরেটও (৭৪.০৭) যে খুব আকর্ষণীয়, বলা যাবে না। আশরাফুল অবশ্য এটি নিয়ে খুব একটা ভাবছেন না, ‘স্ট্রাইকরেট আরও বাড়বে যখন আমি আরও বেশি ফিট হব। এখনো সেভাবে ফিট না বলেই স্ট্রাইকরেট ৭৫। আরেকটু ফিট হলে এটা এমনি ৯০ হয়ে যাবে।’
ম্যাচ ফিক্সিংয়ের নিষেধাজ্ঞায় দীর্ঘদিন ঘরোয়া ক্রিকেটের দরজা বন্ধ ছিল। সেটি খুলেছে। ৩৩ বছর বয়সী আশরাফুলের বিশ্বাস, ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো খেললে হয়তো বন্ধ হয়ে থাকা জাতীয় দলের দরজাটাও একদিন খুলবে, ‘এ আশা-স্বপ্ন থেকেই তো এত কষ্ট, পরিশ্রম করা। তবে এটা নিয়ে এখনই চিন্তা করছি না। এখনো সামনে প্রিমিয়ার লিগের আরেকটা ম্যাচ আছে। চেষ্টা করব আরেকটা সেঞ্চুরি করতে। সামনে বিসিএলে ম্যাচ আছে। বিপিএল আছে। বিপিএলে ভালো কিছু করতে পারলে নির্বাচক, বোর্ড বিবেচনা করতেও পারে। ধাপে ধাপে আমাকে এগোতে হবে। তবে…’

তবে কী? ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হলেও আশরাফুল বলছেন, ‘তবে জানি জাতীয় দলে ফেরাটা অনেক কঠিন। বাংলাদেশ দল এখন অনেক ভালো করছে। তারপরও স্বপ্ন দেখতে হবে।