বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন নোম্যান্সল্যান্ডে অপেক্ষমাণ রোহিঙ্গারা

বাংলাদেশ

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা কক্সবাজারের উখিয়ার আঞ্জুমান পাড়া সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে অপেক্ষমাণ কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার পর কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

গত চার দিন ধরে সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে অপেক্ষার পর ১৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার তাদের কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে সরিয়ে নিচ্ছে বিজিবি। একইসঙ্গে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারেন।

জানা গেছে, গত চারদিন ধরে নোম্যান্সল্যান্ডে অবস্থানের পর রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করলেও বিজিবির বাধায় ঢোকা সম্ভব হয়নি। আজ (১৯ অক্টোবর) আঞ্জুমান পাড়া সীমান্ত অতিক্রম করে তারা বাংলাদেশে ঢোকার অনুমতি পেয়েছেন। বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পেরে আনন্দের পাশাপাশি তাদের আশা, এখানে তারা অন্তত মানবিক সহায়তাটুকু পাবেন।

বিজিবি কর্মকর্তারা বলছেন, অনেকটা মানবিকতা থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমারে এখনও সংঘাত চলছে। অগ্নিসংযোগের ঘটনা এখনও অব্যাহত রয়েছে। যার ফলে এসব রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ১৭ অক্টোবর মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে নতুন করে আবারও অগ্নিসংযোগ করছে দেশটির সেনাবাহিনী। নতুন করে এই নির্যাতন শুরু হওয়ার পর থেকেই গত ১৫ অক্টোবর রোববার থেকে নতুন করে বাংলাদেশ অভিমুখে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল নেমেছে

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসছে রোহিঙ্গারা। ছবি: প্রিয়.কম

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসছে রোহিঙ্গারা। ছবি: প্রিয়.কম

ইউএনএইচসিআর-এর ওই বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গা গ্রামে আগুন দিতে সেনাবাহিনীর সাথে সহযোগিতা করছে অন্যান্য নিরাপত্তাবাহিনী ও স্থানীয় লোকজন (বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা)।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ হাজির করেছে। অ্যামনেস্টি বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দী, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি-ভিডিও এবং সব ধরনের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে, ‘রাখাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং এটি মানবতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অপরাধ।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম চুক্তিতে যে ১১ ধরনের অপরাধকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, রাখাইনের সহিংসহায় তার মধ্যে ৬টি অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ অপরাধগুলোর মধ্যে রয়েছে, হত্যা, জোরপূর্বক নির্বাসন, ধর্ষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন।

গতকাল বুধবার রোহিঙ্গা বিষয়ে সাম্প্রতিক অগ্রগতি নিয়ে সচিবালয়ে নিজ দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনোটা বাদ দেওয়া হয়নি। আমাদের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও জনসংযোগ কার্যক্রমের ফলেই আজ আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।’

এদিকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য বিশ্ব সম্মেলের ডাক দিয়েছে জাতিসংঘ। আগামী ২৩ অক্টোবর জেনেভায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি, জরুরি ত্রাণ সমন্বয়ক ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকোক ও আন্তর্জাতিক অভিবাসনবিষয়ক এজেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (আওএম) মহাপরিচালক উইলিয়াম লেসি সুইং এ সম্মেলনের পরিকল্পনা করেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫ লাখ ৮২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ৬ লাখেরও বেশি।

সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে পালিয়ে আসার হার আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও, অক্টোবরের ১৫ তারিখ থেকে তা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। চলমান রোহিঙ্গা ঢল অব্যাহত থাকলে শরণার্থীর এ সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।