বাংলাদেশে সাইবার বীমা কবে?

প্রধান খবর বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উন্নত দেশগুলোতে সাইবার দুনিয়ার সুরক্ষিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ও সাইবার হামলার মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হলে তার জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে সাইবার বীমার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এমন ধরনের কোনও উদ্যোগ নেই। অথচ বাংলাদেশ সাইবার হামলার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিষয়টি কেউ আমলে নিচ্ছে না। এরই মধ্যে সাইবার হামলার মাধ্যমে বড় ধরনের ক্ষতি হলেও এ বিষয়ে কোনও নজর নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাইবার বীমা আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। এখনই তা চালু করা না হলে ভবিষ্যতে হয়তো দেশকে আরও বড় কোনও মাসুল দিতে হবে। তারা আরও বলছেন, বাংলাদেশে ব্যাংকে সাইবার হামলা চালিয়ে লুট করা অর্থ ফিরে পাওয়া যায়নি। তবে সাইবার বীমা করা থাকলে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণ আদায় করে আর্থিক ক্ষতি সামাল দেওয়া যেত।
ইন্টারনেট ঘেঁটে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেনসহ ইউরোপের অনেক দেশেই সাইবার বীমা চালু রয়েছে। যুক্তরাজ্যের বড় বড় প্রতিষ্ঠানেও চালু হয়েছে সাইবার বীমা, যার হার ২ শতাংশের বেশি। আরও জানা গেছে, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার নিরাপত্তা বীমা বাবদ ব্যয় হয়েছে আড়াইশ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দেশে সাইবার বীমা চালুর পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। তবে বাস্তবায়নে কিছু সমস্যা থাকায় তা চালু করতে দেরি হচ্ছে।
শেখ কবির বলেন, ‘বীমা খাতে এটা একটা নতুন পণ্য। বীমা বিশেষজ্ঞরা এটা আনতে চাইছেন না। হয়তো বাজার এখনও সেভাবে প্রস্তুত নয় বলে বলে তাদের আগ্রহটা কম। তবে আমরা সাইবার বীমা চালুর বিষয়ে আন্তরিক।’
বিআইএ সভাপতি জানালেন, প্রাইভেট বীমা কোম্পানিগুলোর সাইবার বীমা চালু নিয়ে আগ্রহ কম। এ ক্ষেত্রে সরকার এগিয়ে এলে এটা চালু করা সহজ হবে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ‘শস্য বীমা’ চালুর বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘এটা (শস্য বীমা) অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাধারণ বীমা এটাকে পাইলটিং করছে। সরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান বলেই সাধারণ বীমার পক্ষে এটা চালু করা সহজ হয়েছে।’ তিনি সাইবার বীমা চালুর বিষয়ে সরকার, দাতা সংস্থা ও বিশ্ব ব্যাংককে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
প্রসঙ্গত, অন্যান্য বীমার মতো সাইবার বীমাও একটি ক্ষতিপূরণ সেবা। চুক্তি অনুযায়ী সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি বিশেষ বা প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটারের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখাশোনা করে থাকে। সাইবার আক্রমণে যদি বীমা চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটারের তথ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা হারিয়ে যায়, তাহলে বীমা প্রতিষ্ঠান সেই ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকে। বীমা করতে হলে কোম্পানিকে তাদের নিজেদের সুরক্ষিত নিরাপত্তা আগেই নিশ্চিত করতে হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বীমা কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করে। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করার ক্ষেত্রে একেক প্রতিষ্ঠান একেক নিয়ম মেনে চলে।
সাধারণত ই-কমার্স, ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস কারখানা ও যাবতীয় সাপ্লাই চেইন সার্ভিস এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য সাইবার বীমা করা হয়ে থাকে।
জানতে চাইলে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক বলেন, ‘অবশ্যই সাইবার বীমা চালু হওয়া উচিত। কিন্তু সে ধরনের উদ্যোগ তো দেখছি না।’ তিনি মনে করেন, সাইবার বীমাকরণ বাধ্যতামূলক করা হলে প্রতিষ্ঠানের সাইবার আক্রমণও কমে যাবে। ফলে ক্ষয়ক্ষতিও কম হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তার সঙ্গে তার গ্রাহকদের সেবা দিতে পারবে। ইমদাদুল হক আরও বলেন, ‘ইউরোপের অনেক দেশে সাইবার বীমা চালু রয়েছে। আমাদের দেশীয় বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।’
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘আসলে নিরাপত্তার কোনও বিকল্প নেই। সাইবার বীমা করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বীমা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া শর্ত ও মান পূরণ করতে হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এমনিতেই শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার বীমা চালু হলে সাইবার আক্রমণের হারও কমে যাবে।’
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির ‘সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাইবার ক্রাইম প্রিন্সিপালস’ নামক গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, সাইবার বীমা হলো বীমা খাতে দ্রুত বর্ধনশীল একটি খাত যা একটি কোম্পানিকে ঝুঁকি এবং বড় ধরনের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করে।