বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের নক্ষত্র মাশরাফির ১৬ বছর

ক্রিকেট খেলাধুলা

মাশরাফি বিন মুর্তজা বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক নক্ষত্রের নাম। সোনালী হরফে লেখা থাকবে তার নাম যুগ যুগ ধরে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে যারা গড়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম সেরা মাশরাফি।

এদেশের ১৬ কোটি মানুষের আশা আকাঙ্খার প্রতিক ক্রিকেট যেন মাশরাফিদের কথা বলে। সফল ব্যক্তিত্ব, সফল অধিনায়ক, একজন ভাল মানুষ, একজন সফল ক্রিকেটার সর্বোপরি দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা রয়েছে তার। যখন খেলেন তখন দেশের কথা চিন্তা করেই নিজেকে উজার করে দেন। এটাই দেশপ্রেম।

২০০১ সালের ৮ নভেম্বর। বাংলাদেশ দলে অভিষেক ঘটে ১৭ বছরের এক তরুণ পেসারের। জিম্বাবুয়ে তখন পরাশক্তি না হলেও, বিশ্ব ক্রিকেটে ছিল সমীহ জাগানিয়া দল। দলে আছে হিথ স্ট্রিক, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্রান্ট ফ্লাওয়ারদের মতো তারকা ক্রিকেটাররা। এমন দলের বিপক্ষে সেদিন সেই তরুণ পেসার বল হাতে তোলেন গতির ঝড়। ১০৬ রানের বিনিময়ে প্রতিপক্ষের চার উইকেট তুলে নিয়ে অভিষেকেই তার জাত চেনান।

সেই শুরু, এরপর কেটে গেছে ১৬টি বছর। সেদিনের সেই বিস্ময় বালক আজকে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের বর্তমান ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। এখন থেকে ঠিক ১৬ বছর আগে এই দিনটাতেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ খ্যাত মাশরাফির। বাংলাদেশ ক্রিকেটে তিনিই প্রথম ক্রিকেটার যিনি মাঠে থেকেই পূর্ণ করতে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১৬ বছর, পা রাখবেন ১৭ বছরে!

অনেক উত্থান আর পতনের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে মাশরাফির ক্যারিয়ার। দূর্ভাগ্যজনক কিছু ভয়াবহ ইনজুরির শিকার হয়ে বারবার ছিটকে পরেছেন ক্রিকেট দুনিয়া থেকে। ক্যারিয়ারের এই ১৬ বছরে দুই হাঁটুতে অস্ত্রপচার হয়েছে সাতবার। তবুও দমে যাননি তিনি। প্রতিবারই দুঃসময়ের সাথে লড়াই করে যখনই ফিরেছেন, প্রমাণ করেছেন নিজেকে। নিজে ওঠে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে দেখিয়েছেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য সাহসিকতা।

এই ইনজুরির কারনে, টেস্ট ছেড়েছেন ২০০৯ সালেই। মাঝে ২০১১ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলা হয়নি। আর সেটার দুঃখ ভুলতেই কি না, ২০১৫ সালে এসে দেশের ইতিহাসেই সেরা বিশ্বকাপ স্মৃতি উপহার দিলেন মাশরাফি। তার নেতৃত্বেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ পৌছায় বিশ্ব ক্রিকেট মঞ্চের কোয়ার্টার ফাইনালে। এরপর থেকে দলের পারফরম্যান্সের উর্ধ্বমূখী গ্রাফটা এখন গোটা বিশ্বের কাছেই স্পষ্ট।

আর সব কিছুর মূলে এই মাশরাফি। ওয়ানডে বিশ্বকাপ শেষে দেশের মাটিতে একে একে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও সর্বশেষ আফগানিস্তানসহ টানা ছয়টি ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ এই মাশরাফির নেতৃত্বেই। শুধু তাই নয়, মাশরাফির হাত ধরেই প্রথমবারের মতো আইসিসির কোনো টুর্নামেন্টে সেমি-ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে গত বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্ট নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াকে বিদায় করে পৌঁছে যায় শেষ চারে।

গেল ১৬ বছরে বাংলাদেশের হয়ে ৩৬ টেস্ট, ১৮২ ওয়ানডে ও ৫৪ টি-টোয়েন্টি খেলা মাশরাফি ব্যাট-বল হাতেও কম যাননি। অভিষেকের পর থেকে টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে এখন পর্যন্ত তার ঝুলিতে রয়েছে ৩৫২টি উইকেট। অসাধারণ নেতৃত্বগুণের পাশাপাশি লড়াকু খেলোয়াড়, অদম্য মানসিকতার অধিকারী মাশরাফির ব্যাটে দেখা গেছে লোয়ার মিডল অর্ডারের ‘ক্যামিও’ কিছু ইনিংস। ব্যাট হাতে ক্রিকেটের সব সংস্করণ মিলিয়ে তার সংগ্রহ ২৭৭৮ রান। রয়েছে চারটি হাফসেঞ্চুরিও।

লাল-সবুজের পতাকা মাথায় নিয়ে ইতিহাসের পর ইতিহাস গড়ে দিয়ে যাচ্ছেন এই মাশরাফি। টেস্ট, ওয়ানডের পাশাপাশি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও দ্যুতি ছড়িয়েছেন মাশরাফি। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের ইতি টানার আগে ২৭ ম্যাচে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেন মাশরাফি। তার হাত ধরেই দল সবচেয়ে বেশি নয়টি জয় পেয়েছে টি-টোয়েন্টিতে। ৫৪টি টি-টোয়েন্টি খেলা মাশরাফি বোলিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকেই। দেশের হয়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট তার দখলে।

বাংলাদেশে ক্রিকেটে মাশরাফিই একমাত্র ক্রিকেটার যিনি কিনা কয়েক প্রজন্মের সঙ্গেই খেলে চলেছেন। সাবেক ক্রিকেটার আকরাম-সুজন-পাইলট থেকে শুরু করে শরীফ-বৈশ্য-তালহা-আশরাফুলদের সঙ্গে খেলেছেন তিনি। এরপর সাকিব-তামিম-মুশফিকদের সঙ্গেও খেলেছেন। আর এখন মিরাজ-সাব্বির-তাসকিনদের সঙ্গেও সমান তালেই খেলে চলেছেন এই তারকা ক্রিকেটার।

মাশরাফির আগে আকরাম খানের ক্যারিয়ার ১৪ বছর ১৮৭ দিনের। আরেক সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বয়স ১৪ বছর ৪৪ দিন। মিনহাজুল আবেদীনের ১৩ বছর ৬১ দিন। তাদের সবার সঙ্গেই খেলেছেন মাশরাফি। ১৬ বছর পূর্ণ করার দিনটিতেও মাঠেই থাকবেন তিনি। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নয়, বাংলাদেশের প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) এবারের আসরে রংপুর রাইডার্সের জার্সি গায়ে মাঠ মাতাবেন গেল অক্টোবরে ৩৪ বছরে পা দেওয়া মাশরাফি।