মিয়ানমারের অন্য মুসলমানেরা কিভাবে দিন কাটাচ্ছে

অন্যান্য আন্তর্জাতিক

দেশটির সবচেয়ে বড় শহর ইয়াঙ্গন থেকে তুন চি নামের একজনের সাক্ষাতকার নিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি। মিয়ানমারেই এই তন চি’র বাড়ি। এই দেশে তিনি জন্মেছেন, বড় হয়েছেন। অন্য হাজারো বার্মিজদের মতো মিলিটারি জান্তার বিরুদ্ধে তিনিও রাস্তায় আন্দোলন করেছেন গণতন্ত্রের দাবিতে। দশ বছর তিনি কারাগারেও কাটিয়েছেন।

আজ তিনি মিয়ানমারের সাবেক রাজবন্দী পরিষদে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি ঐসব মুসলমানদের একজন, যারা আশা করেন যে ২০১০ সালে সেনা-শাসনের অবসানের পর মুসলমানরা সমাজে তাদের যথাযথ অবস্থান ফিরে পাবে। তিনি বলেন, “২০১২ সালে রাখাইনে সহিংসতার পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। কেবল রোহিঙ্গা মুসলিমরাই উল্টো স্রোতের মুখোমুখি হয়েছেন এমন নয়, পুরো মুসলমান সম্প্রদায়ই আসলে এই সমস্যার মধ্যে পড়ে গেছেন”।

তুন চি’র পূর্বপুরুষরা এক সময় ভারত থেকে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে এসেছিলেন। এসেছিলেন অনেক পুরুষ আগে, তখন দেশটি বার্মা নামে পরিচিত ছিল। ২০১২ সালে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধ আর রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষের পর এক লক্ষ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। বেশীরভাগ বাস্তুচ্যুত, বিশেষ করে রোহিঙ্গা মুসলমানরা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে যায়

ইয়াঙ্গনের একটি মসজিদে এক শুক্রবার আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। আমি দেখলাম শতশত পুরুষ মসজিদে ঢুকছে। অনেকের মাথায় টুপি, তাঁরা নামাজের জন্য তৈরি হচ্ছেন। নামাজের জন্য আসা অনেকের সঙ্গে আলাপে এটা পরিষ্কার বুঝতে পারলাম রাখাইনে যা ঘটছে তা নিয়ে এই সম্প্রদায়ের মানুষ কতটা অস্বস্তিতে আছে। রোহিঙ্গা মুসলিম জঙ্গি গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা ২৫শে অগাস্টে রাখাইন অঞ্চলে মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলা করার পর সেখানে সহিংসতা শুরু হয়। জবাবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পাল্টা ব্যবস্থা নেয়, যাকে তারা বলছে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান।

এরপর পাঁচ লক্ষেরও বেশী রোহিঙ্গা মুসলিম সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচে – একই সঙ্গে উঠে আসে ধর্ষণ আর বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সব খবরাখবর। রোহিঙ্গাদের এই পালিয়ে বাঁচাকে জাতিসংঘের সিনিয়র কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার কর্মীরা বর্ণনা করেছেন ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে – তবে মিয়ানমারের সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

“রাখাইন রাজ্যের সমস্যা খুবই ভয়ঙ্কর,” নামাজ পড়তে আসা মুহাম্মদ ইউনুস আমাকে ফিসফিস করে বললেন। “এমন উদ্বেগও আছে যে সহিংসতা ইয়াঙ্গন এবং অন্যান্য এলাকাতেও ছড়াতে পারে।” তিনি বলেন যে দেশের অন্য এলাকার মুসলমানরা কী বলছেন কিংবা প্রতিদিন কী ধরণের কাজ করছেন- এসব নিয়ে খুব সাবধানী হয়েছেন। “রাখাইনে জন্ম নিয়েছেন আর বড় হয়েছেন এমন অনেক মানুষ এখন ইয়াঙ্গনে বাস করছেন, ইউনুস জানান। “তবে তাঁরা তাদের পরিবারের সদস্য আর আত্মীয়দের নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।”

ধারণা করা হয় যে মিয়ানমারের পাঁচ কোটি ৩০ লক্ষ বাসিন্দার মধ্যে ৪.৫ শতাংশ মুসলমান। রোহিঙ্গাদের ধরেই এই হিসাব। তবে মুসলিম নেতারা এমন যুক্তি দেন যে তাদের আসল সংখ্যা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণের মতো হতে পারে। অনেক রিপোর্টে বলা হয় যে মুসলমানরা মিয়ানমারে শতশত বছর ধরে বাস করছেন। ব্রিটিশ শাসনের সময় তাদের সংখ্যা বাড়ে, কারণ সে সময় অনেকে দেশটিতে অভিবাসী হয় কিংবা তাদেরকে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে নিয়ে আসা হয়।