মোটা টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট!

অন্যান্য অপরাধ ও দুর্নীতি

সাইনবোর্ড, ব্যানার, সিল বানানো এবং কম্পিউটার কম্পোজের কাজই চলতো দোকানটিতে। দৃশ্যমান বলতে এতটুকুই। তবে আড়ালের ব্যবসা আরো বড়। সরকারি দলিল, সার্টিফিকেট , স্ট্যাম্প, লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, বিআরটিএ’র ড্রাইভিং লাইসেন্স, ডিজিটাল নম্বর প্লেট থেকে শুরু করে সবধরনের নথিপত্র তৈরি করা হতো। তবে তা আসল নয়, জাল। আসল কপির হুবহুব নকল করে তা টাকার বিনিময়ে সরবরাহ হতো গ্রাহকের কাছে।

টাকার বিনিময়ে তাদের কাছে মিলতো বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটও। জাকির হোসেন বাবুল (৩২) ও মাসুদ হাওলাদার (৩৪) নামে দুই ব্যক্তি ২০১৩ সাল থেকে অবৈধ এই ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন। শুধু দোকান নয়, নিজ বাসায়ও এই জালিয়াতির ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন তারা। জাল ও ভুয়া সার্টিফিকেট ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায়, নকল ডিজিটাল লাইসেন্স ৫০০ টাকায় এবং গাড়ির ডিজিটাল নম্বর প্লেট ১৫০০ থেকে ২,০০০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতেন তারা। তাদের চক্রে রয়েছে একাধিক সদস্য। অন্যরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চাহিদা মতো এসব জাল সার্টিফিকেট গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করতো। তবে শেষ পর্যন্ত র‌্যাবের জালে ধরা পড়েছেন প্রধান দুই প্রতারক।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত রাজধানী ও এর আশপাশে এলাকায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাব-১০ এর একটি দল তাদের আটক করে। গতকাল রাজধানীর কাওরানবাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।

র‌্যাব জানায়, বুধবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চালানো ওই অভিযানে আটক জাকির হোসেন বাবুলকে ডেমরার কোনাপাড়ার শূন্য টেংরা এলাকা এবং মাসুদ হাওলাদারকে গাজীপুর সদর থানার মীরেরবাজার এলাকায় সাতপোয়া থেকে আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ট্রেনিং সেন্টারের নকল ও জাল সার্টিফিকেট, নকল ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নকল ডিজিটাল নম্বর প্লেট, গাড়ির নকল ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন কার্ড, নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্প, এগুলোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি এবং নানা যন্ত্রপাতি জব্দ করে।

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাকির হোসেন বাবুল ২০০৮ সালে ডিএমপি ঢাকার সূত্রাপুর থানার লক্ষ্মীবাজার সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন এবং মাসুদ ১৯৯৫ সালে আজিমপুরের নিউ পল্টন লাইন হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেন। এদের মধ্যে জাকির ২০০৩ সাল থেকে নীলক্ষেত এলাকায় একটি দোকানে সাইনবোর্ড, ব্যানার, সিল ও কম্পিউটার কম্পোজের আড়ালে এসব জালিয়াতির ব্যবসা করে আসছিলেন। তার সহযোগী হিসাবে মাসুদ ২০১৬ সাল থেকে এই কাজে জড়িয়ে পড়ে।

গত ৮-৯ মাস আগে নীলক্ষেত ব্যবসায়ী সমিতি বহুতল বিল্ডিং তৈরীর কারণে দোকানটি ভেঙে দেয়। এরপর জাকির তার কোনাপাড়ার নিজ বাসায় এই কাজ করে আসছিল। বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সরঞ্জামাদি ব্যবহার করে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ট্রেনিং সেন্টারের নকল ও জাল সার্টিফিকেট, নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্প, বিআরটিএর নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নকল ডিজিটাল নম্বর প্লেট, গাড়ির নকল ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও নকল হলোগ্রাম স্টিকার তৈরি করতো তারা। এ চক্রের অন্যতম সদস্য রিপন, আরিফ ও রফিকসহ বেশ কয়েকজন এ সব নকল ও জাল সরঞ্জামাদি তাদের কাছ থেকে সংগ্রহপূর্বক দেশের বিভিন্ন স্থানে চাহিদা অনুযায়ী পৌঁছে দিতো। আটককৃতদের ভাষ্যমতে, জাল ও ভুয়া সার্টিফিকেট ৫০০-১০০০ টাকা, নকল ডিজিটাল লাইসেন্স ৫০০ টাকা এবং গাড়ির ডিজিটাল নম্বর প্লেট ১৫০০-২০০০ টাকায় বিক্রি করতো তারা।

বিআরটিএ এর নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নকল ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও লাইসেন্সসমূহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহার করা হতো। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ট্রেনিং সেন্টারের নকল ও জাল সার্টিফিকেটসমূহ দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন চাকরির জন্য আবেদন করার কাজে ব্যবহৃত হয়। র‌্যাব জানিয়েছে, পলাতক আসামি রিপন, আরিফ ও রফিকসহ চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ব্যাপারে একটি প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা প্রক্রিয়াধীন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।