যে পাঁচ কারণে মুশফিকের অধিনায়কত্ব কেড়ে নেওয়া উচিত

ক্রিকেট খেলাধুলা

ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ ড্র। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও টেস্ট সিরিজ ড্র। সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়াকেও প্রথমবারের মতো টেস্ট ক্রিকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশ। সেটা এই দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের ঠিক আগমুহূর্তেই। এর সবই হয়েছে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের নেতৃত্বে। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল টেস্ট অধিনায়ক ডানহাতি এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশও নেই। কিন্তু সাদা পোশাকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সব যোগ্যতাই যেন মুশফিক হারাতে বসেছেন প্রোটিয়াদের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ পরাজয়ে। শুধু বাংলাদেশই নয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেন মুশফিকের নেতৃত্ব থেকে সরানোর ইজারা নিয়ে বসেছে।

সম্প্রতি ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম স্পোর্টসকিডা তাদের একটি প্রতিবেদনে মুশফিককে কেন অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরানো প্রয়োজন, সেই ব্যাখ্যায় পাঁচটি কারণ দেখিয়েছে। প্রত্যেকটি কারণেই মুশফিকের মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও বড় করে দেখানো হয়েছে তার ব্যক্তিত্ব, মানসিকতা, ক্রিকেটীয় রণকৌশল ও দলের ব্যাপারে তার ভাবনার অপরিপক্কতাকে। সঙ্গে যোগ হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে মুশফিকের বেশকিছু সিদ্ধান্তের সমালোচনা। তবে ওইসব সিদ্ধান্তের পেছনে পর্দার আড়ালে কেউ একজন কলকাঠি নেড়েছেন, তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কৌশলগতভাবে অকার্যকর ও নেতিবাচক ব্যবহার সতীর্থ ও আম্পায়ারের সঙ্গে মুশফিক।

পচেফস্ট্রুমে সিরিজের প্রথম টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যাটিং সহায়ক উইকেট বানিয়েছিল। তারপরও মুশফিকুর রহিম টসে জিতে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন। তার এমন সিদ্ধান্ত সাবেক অধিনায়কদের অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন।
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের বোলিং লাইনআপকে চাপে রাখা শুরু করে স্বাগতিক ব্যাটসম্যানরা। যথারীতি ম্যাচে হার মানতে হয় বাংলাদেশকে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হল, দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টেও টস জেতেন মুশফিকুর রহিম। এবারও ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত! তার এসব কৌশল তাকেই অকার্যকরী হিসেবে প্রমাণ করছে বারবার। বোলাররা যখন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, মুশফিক তখন অধিনায়ক হয়েও সীমানার কাছে ফিল্ডিং করছেন। চোখেমুখে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার ভাবটাও প্রবলভাবে দৃশ্যমান ছিল। যদিও ফিল্ডিং করার বিষয়টি নিয়ে কোচের দিকে আঙুল তুলেছেন মুশফিক।
তবে সব মিলিয়ে বলা যায়, এসবই ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে খারাপ অধিনায়কত্বের চিত্র।
দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দূরদর্শিতার অভাব ব্যর্থ মুশফিক।

বাংলাদেশের মতো ক্রিকেটে উন্নতির পথে হাঁটতে থাকা একটি দলের অধিনায়কের উচিত দলের ভবিষ্যত দূরদর্শিতার ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা রাখা। তাতে করে এশিয়ার এই দলটির ভবিষ্যৎ তরুণ ক্রিকেটাররাও নিজেদের পরিকল্পনার ব্যাপারে ধারণা পাবে।
একজন ভাল নেতা খারাপ পরিস্থিতি থেকে পুরো দলকে তুলে নিয়ে ইতিবাচক ভাবনা দিয়ে সাহায্য করতে পারে। তাতে পুরো দল উপকৃত হবে। কিন্তু মুশফিক এসব নিয়ে কখনই মাথা ঘামান না বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, মুশফফিক সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন।

এই মুহূর্তে দলে থাকা ইমরুল কায়েসের মতো জেষ্ঠ্য ক্রিকেটার কিংবা সাব্বির রহমানের মতো নিয়মিত ক্রিকেটাররা ব্যাট হাতে বাংলাদেশের ভিত শক্ত করতে পারছেন না, ভবিষ্যতেও পারবেন না। তাদের স্থানে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত কিংবা নাজমুল হোসেন শান্তর মতো সম্ভবনাময় প্রতিভাবানদের কাজে লাগানো প্রয়োজন। একজন আত্মবিশ্বাসী অধিনায়ক নতুনদের সেই জায়গাটা করে দিতে পারেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য। কিন্তু মুশফিক সেটা করে দিতে পারছেন না।
তরুণ ক্রিকেটাররাও ভাল করছে। তবে বাংলদেশ দলে এমন ক্রিকেটার খুঁজে বের করার জন্য বড়দের আগ্রহ দরকার। এমন পদক্ষেপ নিতে পারলে দলের জন্য দারুণ কিছু হতে পারে। কিন্তু মুশফিকের শরীরী ভাষাই বলে দেয়, সে সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারদের দলে ভেড়াতে ঝুঁকি মনে করেন।

নড়বড়ে ব্যাটিং লাইনআপে মনোযোগ দিচ্ছেন না মুশফিক বাংলাদেশ দলের ব্যাটিংয়ের দুই ভিত।

চলতি বছরের শুরুতে নিউজিল্যান্ড সফরে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশ হারলেও ব্যাট হাতে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছে মুশফিকুর রহিমের দল। কিন্তু এই মুহূর্তে টেস্ট ক্রিকেটে তাদের ব্যাটিং লাইনআপ এককথায় নড়বড়ে। বিদেশের মাটিতে সুযোগ থাকার পরও বারবার ব্যর্থ হচ্ছে দলটির ব্যাটিং লাইনআপ।
মুশফিকসহ দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দুই ক্রিকেটার তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান ছাড়া ব্যাট হাতে কেউ সুবিধা করতে পারছে না। এদের কেউ একজন ইনজুরিতে কিংবা বিশ্রামে গেলে দৃশ্যটা যেন প্রকট হয়ে যায়। সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে চট্টগ্রামে যেভাবে দল বেঁধে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এসেছিল বাংলাদেশ, সেটা থেকেই দলটির ব্যাটিং লাইনআপের দূর্গতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় খানিকটা।

সাদা পোশাকে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব নেওয়ার পর সবমিলিয়ে ২৩২১ রান করেছেন মুশফিক। যেখানে রয়েছে চারটি সেঞ্চুরি ও ১২টি হাফ সেঞ্চুরি। কিন্তু যোগ্যতা ও সামর্থ্যের দিক থেকে মুশফিক আরও অনেক ভাল করতে পারতেন। স্পিন কিংবা পেস বোলিং; ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান বরাবরই দারুণ সব শটে নিজের মুন্সিয়ানা প্রমাণ করেছেন বারবার।
ভাল মানের বিকল্প খেলোয়াড় ব্যবহারে ঝুঁকি নিতে না পারা

দক্ষিণ আফ্রিকায় তামিমের ইনজুরিতে ভুগতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। কিন্তু নেই যোগ্য বিকল্প। ছবি: বিসিবি
অনেক সময়, যোগ্য বিকল্প কিংবা আরও ভাল কাউকে মাঠে নামানোর মতো বিলাসিতা দলের থাকে না। কিন্তু থাকলেও, সেই সুযোগ নেওয়ার মতো মানসিক শক্তি মুশফিকের নেই।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে এই মুহূর্তে মুশফিকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে একাধিক ক্রিকেটার আছেন, যারা দলের টেস্ট অধিনায়কের জায়গা নিতে পারে। শুধু তাই নয়, ওইসব প্রতিদ্বন্দ্বীদের দলকে সঠিক দিকে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্যও রয়েছে। সমর্থকরাও চাইছে, সাদা পোশাকে মুশফিককে সরিয়ে নতুন কেউ বাংলাদেশ টেস্ট দলের জায়গাটা নিক। সবমিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) জন্য মুশফিককে টেস্ট অধিনায়কত্ব থেকে সরানোর এটাই প্রকৃত সময়। তামিম ইকবাল কিংবা সাকিব আল হাসানের মতো ক্রিকেটাররা অনেক বেশি অভিজ্ঞ। সাকিব এই মুহূর্তে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করছে।
মুশফিকের অনিশ্চিত মানসিকতা দলের ভরাডুবির অন্যতম উপাদান হতে পারে

বিশ্বমানের অধিনায়কের জন্য আত্মবিশ্বাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন ভাল নেতার মধ্যে সহজাতভাবেই এগুলো থাকার কথা। কঠিন পরিস্থিতিতে দলকে টেনে তুলতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে যেগুলোর প্রয়োজন তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস অন্যতম।
নিঃসন্দেহে মুশফিকের মধ্যে এই জিনিসের কমতি রয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন সম্প্রতি বলেন, ‘সে (মুশফিক) যদি না-ই জানে কিভাবে ভাল করতে হয়, তাহলে মাঠের মধ্যে হতাশ হবেই! একজন অধিনায়ক হিসেবে তার কাছ থেকে দলের বাকি সতীর্থরা উৎসাহ পেতে মুখিয়ে থাকে। মুশফিক নিজেই নিজের মনোবল নষ্ট করছে।’
বাংলাদেশের মতো ক্রিকেট পাগল জাতির জাতীয় দলের অধিনায়ক হওয়া সম্মানের ব্যাপার। কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্বে যদি আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে তাহলে তা দলকে ডোবানোর কারণ হয়ে দাঁড়াবেই। এমন অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো খুব দ্রুতই বাংলাদেশ তাদের বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক মুশফিককে সরিয়ে নতুন কাউকে জায়গা করে দেবে।