শীতের কুয়াশার চাদর টা যেন হেমন্তই নিয়ে আসে

আবহাওয়া বাংলাদেশ

হিম শীতল হাওয়া, কিছুটা শীত অনুভূতির ছোয়া। গোধূলি সন্ধায় রং চায়ের আড্ডায় ছোট টং এর ঘড়ে প্রেয়সীর প্রানে চেয়ে এক চুমুক চায়ের কাপে। মাঠে সোনালী ধানের মৌ গন্ধে দৌখিনা বাতাসে বইছে হেমন্ত সোনালী দিনের বিকেলে হীম শীতল হাওয়া। হেমন্ত হলো ষড়ঋতুর চতুর্থ ঋতু, যা কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের সমন্বয়ে গঠিত। শরৎকালের পর এই ঋতুর আগমন হয়। এর পরে আসে শীত, তাই হেমন্তকে বলা হয় শীতের পূর্বাভাস। কৃত্তিকা ও আর্দ্রা এ দুটি তারার নাম অনুসারে নাম রাখা হয়েছে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস। ‘মরা’ কার্তিকের পর আসে সর্বজনীন লৌকিক উৎসব নবান্ন। ‘অগ্র’ ও ‘হায়ণ’ এ দু’অংশের অর্থ যথাক্রমে ‘ধান’ ও ‘কাটার মওসুম’। সম্রাট আকবর অগ্রহায়ণ মাসকেই বছরের প্রথম মাস বা খাজনা তোলার মাস ঘোষণা দিয়েছিলেন।এক সময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে।

কারণ, ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত।হেমন্তে কৃষক পায় আমন ধানের ফসল। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে সোনালী ফসলের।হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিক। কার্তিকে ধান পরিপক্ক হয়। এ ঋতুত ফোটে গন্ধরাজ, মল্লিকা, কামিনী, হিমঝুরি, দেব কাঞ্চন।হেমন্তের ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই নবান্ন উৎসবের সূচনা হয়। নবান্ন (অর্থঃ নতুন অন্ন) পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব। নবান্ন হল নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব, যা সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের কোন কোন অঞ্চলে ফসল তোলার পরদিনই দেখা যায় নতুন ধানের নতুন চালে ফিরনি-পায়েশ অথবা ক্ষীর তৈরি করে আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে বিতরণ করা হয় ।পায়েশের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। হেমন্তের আগমন হলে যেন নবান্নে জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়,জামাইয়ের মন তখন বেশ মেয়েকেও বাপের বাড়িতে ‘নাইওর’ আনা হয়।মেয়েকে বাবার বাসায় আনা টা তৃপ্তি যেন পিতার।সেই মধুমাখা সময় মেয়ের পায়ের ছোয়ায় ধন্য হয় পিতার আবাস্থল ভূমি। নবান্নে নানা ধরনের দেশীয় নৃত্য, গান, বাজনাসহ আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালিত হয়। লাঠি খেলা বাউলগান, নাগরদোলা, বাঁশি, শখের চুড়ি, খৈ, মোয়ার পসরা বসে গ্রাম্য মেলায়।ইউরোপে ১লা সেপ্টেম্বর থেকে হেমন্তের শুরু। সেখানে একে বলা হয় বৈচিত্র্যময় রঙ ও পাতা ঝরার ঋতু। ঝাউ গাছগুলো ছাড়া সব গাছেরই পাতা এ সময় ঝরে যেতে শুরু করে এবং শীতের আগমনের আগেই সব বৃক্ষই ন্যাড়া হয়ে যায়।ফুল, ফল বিহীন ।নবান্ন, হেমন্ত ঋতুর শান্ত প্রকৃতি অনেক কবি সাহিত্যিক নানা ভাবে তাদের রচনায় তুলে ধরেছেন, এই হেমন্তের রুপস্বজা, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, জসীম উদ্দীন , জীবনানন্দ দাশ, গোলাম মোহাম্মদ। কাজী নজরুল ইসলামের ‘অঘ্রাণের সওগাত’ কবিতায় নবান্নের চিত্রটি বেশ উপভোগ্য। এছাড়াও এই ঋতুকে নিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিমের রাতে ওই গানটিতে লিখেছেনঃ

হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে, হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে। ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো ‘দীপালিকায় জ্বালাও আলো,জ্বালাও আলো, আপন আলো, সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে।’ বিশ্বকবি তাঁর নৈবদ্যে স্তব্ধতা কবিতায় লিখেছেনঃ ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলে। হেমন্ত ঋতুতে নিয়ে কবি সুফিয়া কামালের ছড়া-কবিতা হেমন্ত।সবুজ পাতার খামের ভেতর হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে কোন্ পাথারের ওপার থেকে আনল ডেকে হেমন্তকে?’জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে ষড়ঋতুর মধ্যে চারটি ঋতুর উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। আর বাকি দুটি ঋতু হেমন্ত ও বসন্ত প্রকৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে গিয়েছে শরতের সাদা কাশফুল ও স্নিগ্ধ হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে হেমন্ত আসে শীতের কুয়াশার চাদর নিয়ে। প্রকৃতিজুড়ে তাই নতুন আবহ তৈরি হয় এ সময়। শিশির বিন্দু ঝরার টুপটাপ শব্দ আর মৃদু শীতলতা জানান দিয়ে যায় ঋতু পরিবর্তনের এ খবর ।সকাল হলে নরম দুর্বা-ঘাসের শিশির কনার ছোয়ায় শিহরিত হয় মন আবেশ। হেমন্ত আমাদের ঋতু-বৈচিত্র্যের সীমাহীন সৌন্দর্যেরই অংশ। যদিও শহরের বহুতল ভবনের স্বচ্ছ কাচের ভেতর নানা রঙের রঙ্গিন পর্দা টাঙানো ঘরে বসে হেমন্তকে উপভোগ করা সম্ভব নয়। হেমন্তকে উপভোগ করতে হলে মনের চোখ মেলে তাকাতেই হবে। যেতে হবে আবহমান বাংলার গ্রামাঞ্চলে।

শিশির-স্নাত সকাল, কাঁচাসোনা রৌদ্র-মাখা স্নিগ্ধ-সৌম্য দুপুর, পাখির কলকাকলি ভরা ভেজা সন্ধ্যা আর মেঘমুক্ত আকাশে জ্যোৎস্না ডুবানো আলোকিত রাত হেমন্তকে যেন আরও রহস্যময় করে তোলে সবার চোখে; প্রকৃতিতে এনে দেয় ভিন্নমাত্রা মন কে জানার। হেমন্তের এই মৌনতাকে ছাপিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে নবান্ন প্রবেশ করে জাগরণের গান হয়ে, মানুষের জীবনে এনে দেয় উৎসবের ছোঁয়া। নবান্ন মানেই চারদিকে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ, নতুন অন্ন, গ্রামের মাঠে মাঠে চলে ধান কাটার ধুম, হেমন্তে এই ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন উৎসব। গৃহস্থবাড়িতে নতুন ধানে তৈরি পিঠাপুলির সুগন্ধ বাতাসে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে হেমন্তের এ শাশ্বত রূপ চিরকালীন। ‘কার্তিক ও অগ্রহায়ণ’ এ দুই মাসকে আমরা হেমন্তকাল হিসেবে জানি। নবান্ন উৎসবের সূচনা হয়। নবান্ন মানে নতুন অন্ন। বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘শস্যোৎসব’। নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে ফসল তোলার পরদিনই নতুন ধানের নতুন চালের ফিরনি-পায়েস অথবা ক্ষীর তৈরি করে আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে বিতরণ করা হয়।