শীত আসার আগেই ঘুরে আসুন সমতল ভূমির চা বাগান থেকে

চা বাগানের কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিলেট কিংবা শ্রীমঙ্গল। চারপাশ সবুজে ঘেরা পাহাড়ি টিলার গায়ে সারি সারি চা গাছ। কিন্তু সমতল ভূমিতেও যে চা বাগান হতে পারে তা পঞ্চগড়ে না গেলে বুঝবেন না। এখানে পাহাড় উপত্যকা নেই, এমনকি নেই কোনো উঁচুনিচু টিলাও। তবে পঞ্চগড়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। আর সেই বৃষ্টিকে কাজে লাগিয়ে ইতোমধ্যেই পঞ্চগড় দেশের অন্যতম চা অঞ্চল হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।

ভারতের শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ির প্রভাবে সীমান্ত পার্শ্ববর্তী এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু চা বাগান। দেশের বাজারসহ আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে পঞ্চগড়ের চা। রপ্তানি হচ্ছে আমেরিকা, জাপান ও দুবাইয়ের মতো দেশে। এখানকার অর্গানিক চা বিক্রি হচ্ছে লন্ডনের বাজারে। তেঁতুলিয়া থেকে দার্জিলিংয়ের দূরত্ব মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার হওয়ায় পঞ্চগড়ের অধিকাংশ চা বাগান এখানে অবস্থিত। কয়েক দশক আগেও এখানে কোনো চা বাগান ছিল না। তবে বর্তমানে এই এলাকায় গড়ে উঠেছে চা শিল্প। এখানকার চা বাগানের মধ্যে কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেট, স্যালিলেন টি এস্টেট, তেঁতুলিয়া টি কোম্পানী, ডাহুক টি এস্টেটের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলার প্রাচীন ইতিহাসে উল্লেখিত বৃহত্তম দূর্গ ভিতরগড় এলাকায় স্যালিলেন টি এস্টেটের অবস্থান যার শেষ প্রান্ত একদম সীমান্ত ঘেঁষে রয়েছে। অপেক্ষাকৃত উঁচু ও দীর্ঘ গড়টাই দুই দেশের সীমান্তরেখা। পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়া যাওয়ার রাস্তায় বাম দিকের চা বাগানগুলো মূলত ভারতের মালিকানাধীন হওয়ায় এই অংশে অনুপ্রবেশ নিষেধ। শুধু চা বাগান নয় এখানকার টি এস্টেটের ভেতরের নির্মাণশৈলীও দারুণ নজরকাড়া। পঞ্চগড়ে ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্তের মাঝে চা গাছ লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই মাঝে চা বাগান রেখে বাংলাদেশ সীমান্তে দাঁড়িয়ে থেকেই আপনি দেখতে পারবেন দূরে থাকা ভারতের ছোট ছোট গ্রামগুলো। সত্যি বলতে কি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো সীমারেখা নেই।

সীমান্ত ঘেঁষে থাকা এই চা বাগানের অপরূপ দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

পঞ্চগড়ে চায়ের উৎপাদন পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হলেও বর্তমানে তা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। চা বাগানের পাশাপাশি পঞ্চগড়ে রয়েছে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এছাড়া দেশের সর্ব উত্তরের সর্বশেষ বিন্দু অর্থাৎ জিরো পয়েন্টও রয়েছে এখানে। শুধুমাত্র জিরোপয়েন্ট দেখার জন্য যেতে হবে আপনাকে শেষপ্রান্ত পর্যন্ত। জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ক্যামেরাবন্দি হওয়ার ইচ্ছে পূরণে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক ভিড় করে সেখানে। চা বাগান, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, মহানন্দী নদী, সাথে তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চল সব মিলিয়ে গুছিয়ে ফেলতে পারেন একটি জবরদস্ত ভ্রমণ পরিকল্পনা। উত্তরবঙ্গে হাড়কাপানো শীত আসার আগেই তাই ঘুরে আসুন বাংলার দার্জিলিং খ্যাত এই অঞ্চল থেকে।

কীভাবে যাবেনঃ 
ঢাকা থেকে পঞ্চগড় যাওয়ার জন্য হানিফ কিংবা নাবিল পরিবহন রয়েছে। ভাড়া পড়বে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। যদি এসি বাসে যেতে চান তাহলে গ্রীন লাইন, আগমনী কিংবা টি-আর ট্র্যাভেলসের বাসে ভাড়া লাগবে ৭৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকার মতো। তবে সমস্যা হলো এই বাসগুলো শুধু রংপুর পর্যন্ত যায়। রংপুর থেকে পঞ্চগড়ে আপনাকে আলাদা পরিবহনে যেতে হবে। পঞ্চগড়ে এসে নামার পর তেঁতুলিয়া-বাংলাবান্ধাগামী লোকাল বাসে ৪৫ টাকা ভাড়ায় এক ঘণ্টায় তেঁতুলিয়া পৌঁছাতে পারবেন। এখান থেকে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো কিংবা পিকনিক কর্নারে রিকশা বা ভ্যান ভাড়া নিবে ৫ টাকা। চা বাগান ও কমলা বাগান দেখার জন্য অতিরিক্ত ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় যাতায়াত করা যাবে। এছাড়া বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর বাসযোগে ২০ টাকা এবং সেখান থেকে জিরোপয়েন্টে বিজিবির অনুমতি সাপেক্ষে ৩০-৫০ টাকায় ভ্যান বা অটোরিকশায় স্থলবন্দরে যাতায়াত করতে পারবেন।

কোথায় থাকবেনঃ 
থাকার জন্য পঞ্চগড় শহরে বিভিন্ন মানের বেশকিছু হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলে বিভিন্ন রকম কক্ষের প্রতিদিনের জন্য ভাড়া পড়বে ১৫০-৬০০ টাকা। তেঁতুলিয়ায় কোনো আবাসিক হোটেল নেই। তবে জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে প্রাচীন কালে নির্মিত একটি ডাকবাংলো রয়েছে। এছাড়া অন্য পাশে রয়েছে তেঁতুলিয়া পিকনিক কর্নার। রাত যাপনের জন্য পিকনিক কর্নারে প্রতি কক্ষের ভাড়া ২০০ টাকা এবং জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর ৪০০ টাকা। এসব বাংলোয় থাকার জন্য জেলা পরিষদ সচিব, পঞ্চগড় কিংবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তেঁতুলিয়ার কাছে আবেদন করে কয়েক দিন আগে থেকেই বুকিং নিতে হয়। এছাড়া বাংলাবান্ধায় রয়েছে দুই কামরার একটি সরকারী বাংলো।

এই ছুটিতে সমতল ভূমির চা বাগান দেখার জন্য পঞ্চগড় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলুন এখনই। ঘুরে আসুন দেশের শেষ প্রান্ত অবধি।

Comments

comments

Leave A Reply

Your email address will not be published.