শেষ হয়ে গেল ডেভিড ওয়ার্নারের ক্যারিয়ার এমনটাই ধারণা করছে অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম

ক্রিকেট খেলাধুলা

বল টেম্পারিং-কাণ্ডে নিষিদ্ধ হয়ে দেশে ফেরার পথে বিমানবন্দরে ওয়ার্নার। ফাইল ছবিবল টেম্পারিং-কাণ্ডে নিষিদ্ধ হয়ে দেশে ফেরার পথে বিমানবন্দরে ওয়ার্নার। ফাইল ছবিতাঁর ক্যারিয়ারের শুরু যতটা নাটকীয় ছিল, শেষটা হতে যাচ্ছে তার চেয়েও বেশি ‘মেলো’। আপাতত ১২ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হলেও অনেকে এখানেই শেষ দেখছেন ডেভিড ওয়ার্নারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। জাতীয় দলের সতীর্থদের কাছে ভীষণ অজনপ্রিয় ওয়ার্নারকে ছেঁটে ফেলে আপাতত ঝড় সামাল দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করছে অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম।

এই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেই তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে অনেককে চমকে দিয়ে টি-টোয়েন্টি দলে এক আনকোরা নতুন খেলোয়াড়কে নামিয়ে দেন নির্বাচকেরা। তখনো শেফিল্ড শিল্ডেই অভিষেক হয়নি ওয়ার্নারের। অস্ট্রেলীয় নির্বাচকদের মধ্যে পাশার দান খেলার খুব বেশি নজির নেই। ওয়ার্নার অস্ট্রেলিয়াতেই তখন অচেনা এক মুখ ছিলেন। এমনকি মেলবোর্নের ডিজিটাল স্কোরবোর্ড অপারেটর খুঁজে পাচ্ছিল না তাঁর ছবি।

সেই ওয়ার্নার এনটিনি-স্টেইন-মরকেল-ক্যালিসদের পিটিয়ে ছাতু বানান। অভিষেকে ৪৩ বলে ৮৯ রানের ইনিংস খেলে জানান দেন নিজের আগমনী বার্তার। ৯ বছর পেরিয়ে এসে সেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেই টেস্ট সিরিজে ঘটে যাওয়া কলঙ্কিত ঘটনার দায় নিয়ে আপাতত ১২ মাসের নির্বাসনে যাচ্ছেন এই বাঁ হাতি। যদিও ওয়ার্নারকে আবার ব্যাগি গ্রিন টুপি পরার সম্ভাবনা দেখছে না অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম।

চ্যানেল নাইন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কেভিন পিটারসেনের সঙ্গে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) যেভাবে বিচ্ছেদ ঘটেছে, সেটা ঘটতে পারে ওয়ার্নারের ক্ষেত্রেও। এক বছরের নিষেধাজ্ঞা শেষে ওয়ার্নারকে জাতীয় দলের পরিকল্পনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ)।

এ ছাড়া ওয়ার্নারের বয়স একটি কারণ। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার পর ওয়ার্নারের বয়স হবে প্রায় ৩২ বছর ৫ মাস। আবারও জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া তাঁর জন্য তখন খুবই কঠিন হবে। তবে শুধু বয়স নয়, ওয়ার্নারের আচরণের কারণেই জাতীয় দলের দুয়ার তাঁর জন্য আর না-ও খুলতে পারে।

মাঠের আচরণের কারণে ওয়ার্নার আগে থেকেই সমালোচিত ছিলেন। ওয়ার্নারের কারণেই কিউই কিংবদন্তি মার্টিন ক্রো একবার ক্রিকেটে ফুটবলের মতো হলুদ ও লাল কার্ড প্রচলনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে নাইটক্লাবে ইংলিশ ক্রিকেটার জো রুটের নাক ঘুষি মেরে ভেঙেছিলেন ওয়ার্নার।

তবে ওয়ার্নার মাঝখানে বদলে গিয়েছিলেন বলে মনে করা হতো। বিশেষ করে পরিবার ও সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল এক পিতার সত্তা তাঁকে পরিণত করেছে বলে মনে করা হতো। সানরাইজার্স হায়দরাবাদকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া, দুই বছর আগের শিরোপা জয় তাঁকে এগিয়ে নিচ্ছিল নেতৃত্বের দিকে। অস্ট্রেলিয়া টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কের ভারও পেয়েছিলেন।

যদিও এবারের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর ওয়ার্নারের ক্যারিয়ার এলোমেলো করে দিল। প্রোটিয়াদের উইকেটরক্ষক কুইন্টন ডি ককের সঙ্গে ড্রেসিংরুম থেকে ফেরার পথে প্রায় হাতাহাতি করা, দক্ষিণ আফ্রিকার এক সমর্থককে গালিবর্ষণ এবং সর্বশেষ বল টেম্পারিং কলঙ্ক। এই ঘটনাগুলো আড়ালে থাকা আরও অনেক কিছু প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া দলের খেলোয়াড়েরাই বলছেন, ওপেনিং সতীর্থ ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে দিয়ে বল টেম্পারিং করার ধারণাটা প্রথমে ওয়ার্নারের মাথাতেই আসে। স্টিভ স্মিথের সম্মতিতে ব্যানক্রফট সেই কাণ্ডটি ঘটান।

দলের প্রায় সবার পরিকল্পনায় এমন ঘটনা ঘটেছে, প্রথম দিকে এমনই একটা ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল। স্মিথ যদিও বলেছিলেন, কেবল ‘লিডারশিপ গ্রুপ’ ব্যাপারটি জানে। পরে জানা গেল, খোদ কোচই জানতেন না এ ঘটনা। আর সিনিয়র ক্রিকেটাররা মনে করেন, ওয়ার্নার তাঁদের ডুবিয়েছে। তাঁদের সম্মান ও গৌরবও এখন কলঙ্কিত।

ওয়ার্নারের সঙ্গে সতীর্থদের দূরত্ব নতুন কিছু নয়। এর আগে দলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকেও নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। প্রায় সময়ই নিজেকে আলাদা রাখতেন। সতীর্থদের বদলে পরিবারকেই সময় দিতেন বেশি। ওয়ার্নারের সঙ্গে বোর্ডের সম্পর্কও তেমন ভালো নয়। বেতন-ভাতা নিয়ে খেলোয়াড়দের ধর্মঘটের সময় সবচেয়ে উচ্চকিত ছিলেন তিনি।

কেপটাউন টেস্টে বল টেম্পারিং নিয়েও কিছু সতীর্থদের চোখের বিষে পরিণত হয়েছেন ওয়ার্নার। কুরিয়ার মেইলের খ্যাতনামা ক্রিকেট সাংবাদিক রবার্ট ক্রাডক ফক্স স্পোটর্সকে জানিয়েছেন, দলের তিন বোলার মিচেল স্টার্ক, জস হ্যাজেলউড ও নাথান লায়ন তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ। কারণ, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) নৈতিকতা তদন্ত কর্মকর্তাদের জেরায় বল টেম্পারিং নিয়ে এ তিন বোলারের বিপক্ষে ওয়ার্নার সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম।

এ ব্যাপারে ক্রাডকের ভাষ্য, ‘দলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন এবং মিচেল স্টার্কসহ পেসারদের সঙ্গেও ওয়ার্নারের কলহ চলছে। এর প্রথম কারণ হলো, ওরা (স্টার্ক, হ্যাজেলউড ও লায়ন) বিশ্বাস করে নৈতিকতা কমিশনারের কাছে ওয়ার্নার প্রমাণ দাখিল করেছে যে বল টেম্পারিংয়ের বিষয়টি তাঁরা জানত। দ্বিতীয় কারণ, চ্যানেল নাইনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে অসমর্থিত সূত্রের উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে বোলাররাও বল টেম্পারিংয়ের ব্যাপারটা জানত।’

টেস্টে ৪৮.২০ গড়ে ২১টি সেঞ্চুরিসহ ৬ হাজারের বেশি রান করা ওয়ার্নার এখনো টেস্ট দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। যদিও তাঁর গড়টা পড়তির দিকে। ২০১৬ সাল থেকে সেটি ৪০-এর ঘরে নেমে এসেছে। এমন গড়ও খারাপ নয়। তবে তাঁর আচরণ বিবেচনায় এমন একজন খেলোয়াড়কে অস্ট্রেলিয়া দল বহন করে চলতে চাইবে না বলেই অনুমান।