সাঁতার কাটতে লন্ডন থেকে বাংলাদেশে

খেলাধুলা প্রধান খবর

মেয়েকে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত জোবায়ের আহমেদ। একেকটি ইভেন্ট শেষ করতেই ওয়ার্মআপ পুলে নামিয়ে দিচ্ছেন। পুল থেকে উঠে আসার পর তোয়ালে দিয়ে পরম স্নেহে মুছে দিচ্ছেন ভেজা চুল।

মেয়েটির নাম জোনায়না আহমেদ। মিরপুর সুইমিং কমপ্লেক্সে কাল শুরু হওয়া জাতীয় বয়সভিত্তিক সাঁতারের চমক। বাবা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। সুনামগঞ্জ থেকে ভাগ্যান্বেষণে ২০০১ সালে পাড়ি জমান লন্ডনে। সেখানেই বিয়ে করেন আরেক প্রবাসী বাঙালি রুজিনা আহমেদকে। জোনায়নার জন্ম লন্ডনে। কিন্তু শেকড়ের টানে চলে এসেছে জাতীয় বয়সভিত্তিক সাঁতারে অংশ নিতে। বালিকাদের ১৫-১৭ বছর বিভাগে অংশ নিচ্ছে গোপালগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে।
লন্ডনের বার্কিং অ্যান্ড ডাগেনহাম ক্লাবের সাঁতারু জোনায়না এরই মধ্যে অংশ নিয়েছে এসেক্স চ্যাম্পিয়নশিপ, লন্ডন আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপ ও বার্কিং অ্যান্ড ডাগেনহাম ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে। ছয় বছরের ক্যারিয়ারে জোনায়ানার শোকেসে শোভা পাচ্ছে শতাধিক পদক।
স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের মফস্বলের মেয়েদের তুলনায় লন্ডনে উন্নত সুযোগ-সুবিধা পায় জোনায়না। অভিজ্ঞ কোচের অধীনে সকাল ও বিকেলে দুই ঘণ্টা অনুশীলন করে বিকোনট্রি অ্যাকুয়াটিকস কমপ্লেক্সে। বাবা মাঝেমধ্যে লন্ডন অলিম্পিক পুলেও নিয়ে যান। জোনায়ানা যে তার বয়সী বাংলাদেশের মেয়েদের চেয়ে অনেক এগিয়ে, সেটি তার ডাইভিং, স্টার্ট ও ফিনিশিং দেখেই পরিষ্কার বোঝা যায়। পারফরম্যান্সও দারুণ। প্রথম দিনে অংশ নিয়েছে চারটি ইভেন্টে। এর তিনটিতেই নতুন জাতীয় রেকর্ড গড়ে সোনা (১০০ ও ৪০০ মিটার ফ্রি স্টাইল এবং ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে)। শুধু ১০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকেই কোনো পদক জেতেনি জোনায়না।
বাংলাদেশের ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগটা হলো কীভাবে? প্রশ্নটা করতেই জোবায়ের আহমেদ পাশে বসা সাঁতারু মাহফিজুর রহমান সাগরকে দেখিয়ে দিলেন। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকের সময় সাগরের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় জোবায়েরের। মেয়েকে নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথাও তখনই জানান সাগরকে। সাগরের মাধ্যমেই ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোল্লা বদরুল সাইফ এবার জোনায়নাকে প্রতিযোগিতায় নামার সুযোগ করে দিয়েছেন।
এত খেলা থাকতে কেন সাঁতারকে বেছে নিয়েছে আপনার মেয়ে? জোবায়েরের হাসিমাখা উত্তর, ‘ওর মধ্যে সাঁতারে সম্ভাবনা দেখেছি। শুরুতে ওকে সাঁতার শেখানোর জন্য পুলে নিয়ে যেতাম। ও এত দ্রুত সাঁতারটা শিখেছে, তা দেখে আমি অবাক। ওর সঙ্গে শিখতে আসা অনেক ইংলিশ মেয়েরাও সেভাবে পারত না। যেখানে সাঁতারের একেকটা লেভেল পার হতে অন্যদের বছরখানেক লাগে, ও সেটা ২-৩ মাসে শেষ করত। এরপরই ওকে আরেকটি সুইমিং ক্লাবে ভর্তি করে দিই।’
জোনায়নাকে সাঁতার শেখানোর জন্য অনেক কষ্ট করেন বাবা-মা। লন্ডনে জোবায়েরের রেস্তোরাঁর ব্যবসা। রুজিনা চাকরি করেন স্থানীয় একটি স্কুলে। জোবায়েরের বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। তারপরও ভোরে অ্যালার্ম দিয়ে রাখেন মেয়েকে অনুশীলনে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর স্কুল শেষে বিকেলের অনুশীলনের পর মায়ের সঙ্গে বাড়ি ফেরে। জোনায়নার মামা-খালারাও লন্ডনে থাকেন। তাঁরাও অনেক সহযোগিতা করেন।
প্রথমবার দেশের পুলে নেমেছে জোনায়না। বাংলা ভালো বলতে না-পারা জোনায়না ইংরেজিতে বলছিল, ‘একটুও নার্ভাস লাগছে না। এখানকার পরিবেশ, পুল খুবই চমৎকার। মনে হচ্ছে যেন লন্ডনেই সাঁতরাচ্ছি।’
জোনায়নার স্বপ্ন বাংলাদেশের হয়ে এসএ গেমস, এশিয়ান গেমস ও অলিম্পিকে অংশ নেওয়া। ওর স্বপ্নের পালে হাওয়া লাগিয়েছেন সাধারণ সম্পাদক মোল্লা বদরুল সাইফ, ‘মেয়েটা বিদেশে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। অথচ দেশের টানে এখানে সাঁতারে অংশ নিয়েছে। আমরা ওকে সুযোগ দিতে চাই। আগামী এসএ গেমসে ওর কাছ থেকে একটা ভালো ফল আশা করছি।’
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী জিমন্যাস্ট সাইক সিজার আর অ্যাথলেট আলিদা শিকদারকে দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদক আনার চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন। এবার সেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে সাঁতার। জোনায়ানা আদৌ স্বপ্নটা পূরণ করতে পারবে কি না, উত্তরটা তোলা রইল সময়ের কাছে।