সাবধান: ভারি স্কুল ব্যাগে চরম বিপদে আপনার সন্তান

প্রধান খবর লাইফস্টাইল

আপনার সন্তানের স্কুল ব্যাগের ওজন কত? জানেন ? কখনও ওজন করে দেখেছেন? দেখেন নি৷ আর তাই, আপনার অজান্তে আপনার ভালোবাসার মানুষটির কতবড় ক্ষতি আপনি করছেন, ভেবে দেখেছেন কি?

স্কুলের নাম যত ভারি, তার স্কুল ব্যাগের ওজন তত বেশি৷ দেশের সব শহর এবং গ্রামের  ক্ষেত্রেই একই হাল৷ বেসরকারি স্কুল ব্যাগের ওজন দেখে আতঙ্কিত শিশু বিশেষজ্ঞরা৷ স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় ব্যাগের ভারে নুইয়ে পড়া চেহারাগুলো দেখেও টনক নড়ে না স্কুল কর্তৃপক্ষের, মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের৷ প্রশ্ন ওঠে না অভিভাবকদের মনেও৷ সন্তানকে ইঁদুর দৌড়ে ঢুকিয়ে দিয়েই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন তাঁরা৷

নিয়মটা কি? শিশুদের স্কুল ব্যাগের ওজন কতটা হওয়া উচিত? বিশেষ করে প্রথম শ্রেণী মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্র ছাত্রীদের জন্য৷ দুঃখের বিষয় এটাই যে, বাংলাদেশে স্কুল ব্যাগের ওজনের কোন অফিসিয়াল নিয়ম নেই৷ তারই সুযোগে যতটা সম্ভব ওজন বাচ্চাদের কাঁধে চাপিয়ে নিজেদের নাম বাড়াচ্ছে বেসরকারি স্কুলগুলি৷ বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে যে,  স্কুলগুলিতে বাচ্চার ব্যাগের ওজন সবচেয়ে বেশি৷ এই দুটি বোর্ডের স্কুলগুলির ছাত্র ছাত্রীদের ক্ষতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি৷

একনজরে দেখে নেওয়া যাক, কি কি মারাত্মক তথ্য উঠে এসেছে স্কুল ব্যাগের ওজন সংক্রান্ত গঠিত কমিটিগুলির রিপোর্টে৷ রিপোর্ট শুধুমাত্র বর্তমানের জন্য৷ ভবিষ্যতের কথা ভেবে আঁতকে উঠেছেন বিশেষজ্ঞরাও৷ একনজরে দেখে নি, কি কি ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে বিশেষজ্ঞদের রিপোর্টে৷

১. ১০ বছরের নীচে গোটা দেশের ৫৮ শতাংশ বাচ্চা মাসল পেন বা পেশির ব্যথায় ভুগছে৷
২. ১২ বছরের নীচে গোটা দেশের ৭৫ শতাংশ বাচ্চা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পরছে, ঘনঘন জ্বর হচ্ছে৷ অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে শরীর খারাপ হচ্ছে বারবার৷
৩. জ্বর সর্দিতে ভোগা বাচ্চাদের নিয়ে বারবার ডাক্তারের কাছে ছুটতে হচ্ছে অভিভাবকদের৷ যার পেছনে অন্যতম কারণ ভারী স্কুল ব্যাগ, বলেই রিপোর্টে প্রকাশ৷
৪. মাথার যন্ত্রণা ও পিঠের ব্যাথায় ভুগছে ভারতবর্ষের প্রায় ৫০ শতাংশ বাচ্চা৷
৫. গ্রামের চেয়ে শহরের বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগের ওজন বেশি৷ তাই এই সমস্ত রোগে ভুগছে শহরের ছেলে মেয়েরাই৷
৬. বই খাতার পাশাপাশি শিশুদের ব্যাগে থাকে টিফিন বক্স, জলের বোতল, আঁকার সরঞ্জাম, পেন্সিল বক্স ইত্যাদি জিনিসপত্র৷ যা ব্যাগের ওজন আরও বাড়ায়৷ যা বিপদের দোরগোড়ায় নিয়ে যাচ্ছে বাচ্চাদের৷
৭. রিপোর্ট বলছে, এমনকি বাচ্চার ব্যাগের ওজন বাচ্চার ওজনের ১৫ শতাংশের বেশি হলেও মাথা, ঘাড়, শিরদাঁড়া ও কোমরের ব্যাথা হতে পারে৷
৮. বাচ্চারা যারা নিজেদের ওজনের ১৫ শতাংশের বেশি ওজনের ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যায় বা আসে তাদের ফুসফুসের রোগ হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি৷ কাশি ও হাঁফানি রোগে ভোগার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি৷ প্রায় ৭৫ শতাংশ বাচ্চা ফুসফুসের রোগে ভুগছে বা ভবিষ্যতে ভুগবে৷

ভবিষ্যতে এই বাচ্চারা যে শিরদাঁড়ার বিভিন্ন অসুখে ভুগবে এমন আশঙ্কাই করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা৷ স্কুল ব্যাগের ওজন ঠিক কত হওয়া উচিত? কি বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা? একনজরে দেখে নি ঠিক কি কি প্রস্তাব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা৷

১. ১০ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগ বওয়ার কোন দরকার নেই৷ ‘No School Bag’ স্লোগানেই বিশ্বাসী বিশেষজ্ঞরা৷
২. একান্তই যদি স্কুল ব্যাগ বইতে হয় তাহলে তাহলে সেটাও হওয়া উচিত বাচ্চার ১২-১৩ বছরের পর৷ অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণী বা তার পরের শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীদের জন্য৷ এমনকি তার ওজন হওয়া উচিত বাচ্চার ওজনের মাত্র ১০ শতাংশ৷ অর্থাৎ বাচ্চার ওজন ২০ কেজি হলে ব্যাগের ওজন কখনই ২ কেজির বেশি হবে না৷
৩. দেশ ও রাজ্যের মানব সম্পদ উন্নয়ন দফতরের উচিত প্রত্যেক স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রত্যেক বাচ্চার জন্য আলাদা আলাদা লকার করার নির্দেশ দেওয়া৷ যাতে ছাত্র ছাত্রীদের শুধুমাত্র সেইদিনের হোমওয়ার্ক খাতা ছাড়া কোন কিছুই স্কুলে নিয়ে যেতে না হয়৷
৪. কোন স্কুল, আইন না মানলে তাদের জরিমানা করা এমনকি বারবার আইন ভাঙলে রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার মত কড়া পদক্ষেপও নেওয়া উচিত মানব সম্পদ উন্নয়ন দফতরের৷
৫. সময় নষ্ট না করে এখনই দেশের মানব সম্পদ উন্নয়ন দফতরের এই বিষয়ে নির্দিষ্ট আইন করা উচিত৷ এবং প্রত্যেক রাজ্যকে সেই আইন লাগু করতে নির্দেশ দেওয়া উচিত৷

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক নির্দেশিকা গুলা মেনে চলা উচিত৷

১. প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত স্কুল ব্যাগের ওজন থাকবে ১ থেকে ১.৫ কেজির মধ্যে৷
২. তৃতীয় শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুল ব্যাগের ওজন হবে ২ থেকে ৩ কেজির মধ্যে৷
৩. ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুল ব্যাগের ওজন হবে ৪ কেজির কম৷
৪. অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত হবে ৪.৫০ কেজির কম৷
৫. দশম শ্রেণীতে স্কুল ব্যাগের ওজন হবে ৫ কেজি বা তার কম৷
৬. ছাত্র ছাত্রীরা কোন বই স্কুল ব্যাগে নেবে না৷ বই থাকবে বাড়িতে৷ স্কুল ব্যাগে শুধুমাত্র থাকবে দুটো খাতা৷ ১০০ পাতার একটি নোটবুক সব সাবজেক্টের জন্য৷ আর একটি ১০০ পাতার খাতা থাকবে হাতের লেখার জন্য৷
৭. ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র ছাত্রীরা প্রত্যেক বিষয়ের জন্য একটি করে ২০০ পাতার নোটবুক স্কুল ব্যাগে রাখতে পারে৷ যদিও সব খাতা প্রতিদিন বয়ে নিয়ে যাবার কোন দরকার নেই৷
৮. বাচ্চারা ব্যাগে জলের বোতল আনবে না৷ স্কুল প্রতিদিন প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রীকে পরিশ্রুত পানীয় জল দেবে৷

নিজেদের গদি বাঁচাতে ভোটেই ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলি৷ তাদের সময় কোথায় বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগের ওজন নিয়ে ভাববার? কিন্তু অভিভাবকদের তো ভাবা উচিত৷ সন্তান আপনার, সেই সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আপনাদেরই এই সমস্যা মেটাতে এগিয়ে আসতে হবে৷ প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত নিজের নিজের বাচ্চার স্কুলে গিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা৷ নিজের ভালোবাসার সন্তানকে রোগমুক্ত রাখতে দেরী করবেন না৷ যত দেরী করবেন ততই ক্ষতি৷

বাচ্চার রোগ কমাতে হলে তার স্কুল ব্যাগের ওজন কমাতেই হবে৷ না হলে ভয়ংকর দিন অপেক্ষা করে আছে আপনার সন্তানের জন্য৷ হয়ত ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত আপনার বাচ্চা৷ আর তার প্রধান কারণ আপনার বাচ্চার স্কুল ব্যাগের মাত্রাতিরিক্ত ওজন৷ এখনই সাবধান হন৷ স্কুল ব্যাগের ওজন বাড়লেই সন্তান সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবে না৷ কিন্তু, সন্তানকে সুস্থ সবল রাখতে, শিক্ষিত মানুষ করে তুলতে হলে প্রথমেই স্কুল ব্যাগের ওজন কমাতে হবে৷ সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে, সরকারের আইন বলবৎ করার জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই উদ্যোগ নিন৷