সিরিজে ফিরতে উইকেট পেতে হবে সাকিবকে

ক্রিকেট খেলাধুলা প্রধান খবর

কোর্টনি ওয়ালশ। খেলোয়াড়ি জীবনের এই কিংবদন্তির বাংলাদেশের বোলিং কোচ হিসেবে পারফরম্যান্স এখন আতশি কাচের নিচে।

আর তা পেসারদের বেসুরো পারফরম্যান্সের কারণেই। কিন্তু দলের যে মূল স্পিনার সাকিব আল হাসান, তাঁর এ বছরের ওয়ানডে পারফরম্যান্সেও তো নেই বসন্ত বাঁশির সুর!
তাঁর বাঁহাতি ঘূর্ণিতে যদি ফেরে পুরনো সুর, তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজেও ‘পুরনো’ বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা জোরালো হবে আরো। সাকিবের চকমকি পাথরের স্পর্শেই হয়তো জ্বলে উঠবেন সতীর্থরা। সে প্রত্যাশা নিয়েই আজ দ্বিতীয় ওয়ানডের দিকে তাকিয়ে থাকবে পুরো বাংলাদেশ। খোলা চোখে তাঁর বোলিং বেশ সাদামাটা। অনেক টার্ন নেই; স্পেশাল ডেলিভারিতে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের হতভম্ব করে দেওয়া ব্যাপারও নেই। কিন্তু বরাবরই ভীষণ চৌকস বোলার সাকিব; ম্যাচ পরিস্থিতি এবং প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের মনোজগৎ পড়ে নেওয়ায় তুলনাহীন। সে কারণেই অত কার্যকর! কিন্তু হালফিলে সেই কার্যকারিতাই তো হারিয়ে যাচ্ছে। এ বছরের ওয়ানডে পারফরম্যান্সই দেখুন না।

১২ ম্যাচের মধ্যে ১০টিতে বোলিং করেন সাকিব। মোট ৮৮ ওভারে এক মেডেন নিয়ে ৪৭৮ রান দিয়ে শিকার মোটে চার উইকেট। ইকোনমি ৫.৪৩। গড় ১১৯.৫০। স্ট্রাইকরেট ১৩২।
সাকিবের সঙ্গে এই পারফরম্যান্স তো যায় না মোটেই!

বছরের শুরুতে ছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ। ডাম্বুলায় প্রথম ওয়ানডেতে স্বাগতিকদের ২৩৪ রানে অলআউট করে ৯০ রানে জেতে বাংলাদেশ। সেখানে আট ওভার বোলিং করে ৩৩ রানে এক উইকেট সাকিবের। উইকেটটি আসেলা গুণারত্নের। দ্বিতীয় ম্যাচে অলআউট হওয়ার আগে ৩১১ রান তোলে শ্রীলঙ্কা। ১০ ওভারে ৫৯ রান দিয়ে সাকিব সেখানে উইকেটশূন্য। সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে ৯ উইকেটে ২৮০ রান স্বাগতিকদের। বাঁহাতি স্পিনার উইকেট পাননি এই ম্যাচেও। আট ওভারে দেন ৪১ রান।

বাংলাদেশের পরের অভিযান আয়ারল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজ। সেখানেও বল হাতে তেমন কোনো কারিকুরি দেখাতে ব্যর্থ সাকিব। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সময় ভেসে যায় বৃষ্টিতে। বোলিংয়ের সুযোগ পাননি তাই। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচে পেয়েছেন। বাংলাদেশ ২৫৭ রানে থেমে যাওয়ার পর অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা নতুন বল তুলে দেন সাকিবের হাতে। কিন্তু কয়েক স্পেলে বোলিং করেও পাননি উইকেট। ১০ ওভারে দেন ৫০ রান। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচে এক উইকেট পান অবশ্য। ৯ ওভারে ৩৮ রান দিয়ে শিকার করেন অ্যান্ডি বালবিরনিকে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচে পান দুই উইকেট। কিউইদের ২৭০ রানে আটকে রাখার পথে আট ওভারে ৪১ রান দিয়ে আউট করেন কোরে অ্যান্ডারসন ও মিচেল স্যান্টনারকে।

কিন্তু ওই ছিটেফোঁটা সাফল্য তাতিয়ে তুলতে পারে না সাকিবকে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে আবার কী ভীষণ বিবর্ণই না তাঁর বোলিং! পুরো টুর্নামেন্টে পাননি একটি উইকেটও। প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের ৩০৫ রান টপকে অনায়াসে জিতে যায় ইংল্যান্ড। সেখানে অধিনায়ক আরো একবার সাকিবের হাতে তুলে দেন নতুন বল; আরো একবার তিনি উইকেটশূন্য; আরো একবার এই চ্যাম্পিয়ন বোলারের কোটা শেষ করান না মাশরাফি। আট ওভারে ৬২ রান যে দেন সাকিব! ওভারপ্রতি ৭.৭৫। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পরের খেলা তো ভেসে যায় বৃষ্টিতে। কিন্তু এখানেও তাত্পর্যপূর্ণ এক ব্যাপার। বাংলাদেশের ১৮২ রানের জবাবে অস্ট্রেলিয়া ৮৩ রান তুলে ফেলে ১৬ ওভারে। এর মধ্যে চার বোলার ব্যবহার করলেও সাকিবকে বোলিং দেননি অধিনায়ক।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচ বাংলাদেশ জেতে সাকিব ও মাহমুদ উল্লাহর অবিশ্বাস্য ব্যাটিং বীরত্বে। ওই সাফল্যে কিছুটা হলেও আড়াল সাকিবের বোলিং ব্যর্থতা। ১০ ওভারে ৫২ রান দিয়ে এ ম্যাচেও উইকেটশূন্য তিনি। যেমনটা ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও। বাংলাদেশের ২৬৪ রান তো ৪০.১ ওভারে এক উইকেট হারিয়ে টপকে যায় ভারত। ৯ ওভারে ৫৪ রান দিয়ে আবার উইকেটবিহীন সাকিব। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে আট ওভারে দেন ৪৮ দেন। পাননি উইকেট; যথারীতি।

উইকেটহীন থাকাটা যেন এ বছর ওয়ানডেতে নিয়ম বানিয়ে ফেলেছেন সাকিব। ১২ ওয়ানডের মধ্যে কেবল তিনটিই পান উইকেট। আর সর্বশেষ পাঁচ ওয়ানডের হিসাব ধরলে উইকেটশূন্য। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অধিনায়ক বোলিংয়ে আনেননি। এটিকে এক পাশে সরিয়ে রাখলেও সর্বশেষ চার ম্যাচে সাকিবের বোলিং ফিগার আঁতকে ওঠার মতো। ৮-০-৬২-০, ১০-০-৫২-০, ৯-০-৫৪-০ এবং ৮-০-৪৮-০। ৩৫ ওভার বোলিং করে ২১৬ রান দিয়ে উইকেটশূন্য। ভাবা যায়!

দ্বিতীয় ওয়ানডের আবহে কাল সহ-অধিনায়ক তামিম ইকবাল অবশ্য সাকিবের বোলিংয়ের পক্ষে ‘ব্যাটিং’ করে গেলেন, ‘সাকিব এমন একজন ব্যক্তি, যে জানে সে কী চায়। ও যদি বোঝে বোলিংটা আরো ভালো করতে হবে, তাহলে সে তা নিয়ে কাজ করবে। সমস্যা হলো কী, যখন সাকিব বা মুস্তাফিজ বল করে তখন প্রতি ওভারে উইকেট আশা করি। এটা তো সম্ভব না। আর আমরা এমন একজনের ব্যাপারে কথা বলছি, যে এক মাস আগে আমাদের টেস্ট জিতিয়েছে দারুণ বোলিং দিয়ে। ’ যথার্থই। আবার একই সঙ্গে ওয়ানডেতে তাঁর সাম্প্রতিক অফ ফর্মও তো উপেক্ষা করা যায় না।

কিন্তু এমন এক চ্যাম্পিয়ন বোলার অফ ফর্মের গহ্বরে থাকবেন আর কত দিন? কত ম্যাচ? আজই তাই হোক না সেই দিন! বল হাতে সাকিবের ‘সাকিব’ হয়ে ওঠার ম্যাচ!