‘স্বাভাবিক সন্তান প্রসবকে হ্যাঁ, সিজারকে না বলুন’

বাংলাদেশ লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য

‘স্বাভাবিক সন্তান প্রসবকে হ্যাঁ, সিজারকে না বলুন’ এই স্লোগান নিয়ে প্রসূতি মায়েদের স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে উদ্বুদ্ধ করারসহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। আরে এ কাজটি টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালনা করছেন খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফরা।

এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার (২৬ এপ্রিল) এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬ জন মা স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করেছেন। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ বছরের শুধু এপ্রিল মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত ৩৭টি নরমাল ডেলিভারি করানো হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ১৬৮টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। আর ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭০৭টি স্বাভাবিক প্রসব করানো হয়েছে। যে টিম এ লক্ষ্যে কাজ করছে তাদের আন্তরিকতা দেখে প্রসুতিরা দিন দিন নরমাল ডেলিভারির ব্যাপারে উৎসাহিত হচ্ছেন।

অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে এপর্যন্ত প্রসব পূর্ববর্তী এএনসি সেবা নিয়েছে ১ হাজার ৩৫৫ জন এবং প্রসব পরবর্তী পিএনসি সেবা নিয়েছে ৪২১ জন। যার ফলে বিগত বছরে স্বাস্থ্য সেবায় বিভাগের মধ্যে তৃতীয় ও জেলার প্রথম হয়েছিল খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

বর্তমানে বেসরকারি হাসপাতাল আর ক্লিনিক কারণে নরমাল ডেলিভারি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অন্যদিকে গ্রামের যেসব মায়েরা স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করতে চান তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে অদক্ষ ও প্রশিক্ষণবিহীন দাইয়ের সরনাপন্ন হতে হয়। এমন এক পরিস্থিতিতে সিজারের নামে বাণিজ্য, দালাল চক্র এবং অদক্ষ দাইমার হাত থেকে প্রসূতি মায়েদের রক্ষায় এবং নিরাপদে নরমাল ডেলিভারি করাতে এগিয়ে এসেছেন খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু রেজা মো. মাহমুদুল হক ও আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা.শামসুদ্দোহা মুকুল। তাদের নেতৃত্বে টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে কাজটি করে যাচ্ছেন খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইরা।

শুধু তাই নয় তারা নরমাল ডেরিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসবে করতে প্রসূতিদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন কৌশলে কাজ করে যাচ্ছেন। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে প্রসূতি নারীদের বিনামূল্যে ‘প্রসূতি কার্ড’ দেওয়া হচ্ছে। এরপর ডেলিভারি না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে কাউন্সেলিং আর ফ্রি চেকআপ, বিনা মূল্যে দেওয়া হয় ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ট্যাবলেট। প্রসূতি কার্ড ও নরমাল ডেলিভারি করাতে মাঠ পর্যায়ের শিক্ষক, চেয়ারম্যান, মেম্বার, ইমাম ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানো হচ্ছে প্রসূতি মায়েদের কাছে। এছাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরাও বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাউন্সিলিং করছেন।

খানসামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নরমাল ডেলিভারী হওয়া উপজেলার গোয়ালডিহি গ্রামের শিমলতলী এলাকার রবিউল ইসলামের স্ত্রী লিপি আক্তার (২৩)বলেন,‘শুরুতে ভয় লাগলেও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাঠ কর্মীদের সহযোগীতায় হাসপাতালে আসার পর নিরাপদে ও স্বাভাবিকভাবে আমার ছেলে সন্তান প্রসব হয়েছে। এতে আমরা অনেক খুশি।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (ভারপপ্রাপ্ত) ডা. শামসুদ্দোহা মুকুল জানান, মাতৃ মৃত্যুর হার কমাতে এবং হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি নিরাপদ করতে দক্ষ মিডওয়াইফরা আছে যার ফলে নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা বাড়ছে এবং প্রসূতিদেরও দিন দিন নরমাল ডেলিভারিতে আগ্রহও বাড়ছে। কারণ হাসপাতালে নিরাপদে ডেলিভারি করানো হলে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে না। পাশাপাশি কোনও টাকা লাগে না না। সবার সহযোগিতা পেলে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বাড়বে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু রেজা মো. মাহমুদুল হক জানান, পুরো উপজেলার গর্ভবতী মায়েদের ডাটাবেজের মাধ্যমে তৈরি করে খোঁজ-খবর নেওয়া হয়। প্রসব পূর্ববর্তী ও পরবর্তী  চিকিৎসা ও পরমার্শ দেওয়া হয়। যার ফলে নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা বাড়ছে।

তিনি আরও জানান, নরমাল ডেলিভারি হওয়ার পর সমাজসেবা অধিদফতরের সহযোগিতায় জন্ম নেওয়া শিশুর জন্য জামা-কাপড়, সাবান, তেল, লোশন, ও মশারিসহ শিশুর ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মাকে

খানসামা উপ‌জেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহ‌মেদ মাহবুব উল ইসলাম ব‌লেন, ‘স্বাভা‌বিক প্রস‌বের জন্য খানসামা উপ‌জেলা স্বাস্থ্য কম‌প্লেক্স যা করছে তা নিঃস‌ন্দে‌হে এক‌টি ভালো কাজ। উপ‌জেলা প্রশাসনও তা‌দের সব ধর‌নের সহ‌যো‌গিতা ক‌রে আস‌ছে। ই‌তিম‌ধ্যে হাসপাকাল‌টি‌তে নারী‌দের জন্য ব্রেস্ট ফ্রি‌ডিং কর্নার, স্বাস্থ্য সেবাসহ যাবতীয় বিষ‌য়ে আলাদা আলাদা ডেক্স করার প‌রিকল্পনা করা হ‌য়ে‌ছে। খুব শিগগিরই এসব কার্যক্রম শুরু হ‌বে। তাছাড়া হাসপাতা‌লের স্বাভা‌বিক প্রসব ও প্রসু‌তি মা‌য়ে‌দের হাসপাতালমুখী করার কার্যক্রমগু‌লো জেলা সমন্বয় সভায় উত্থাপন করা হ‌য়ে‌ছে। যা‌তে ক‌রে সবাই এমন কা‌জে উৎসা‌হিত হয়।