২০০৮–এর বাংলাদেশই তো ভালো ছিল!

ক্রিকেট খেলাধুলা প্রধান খবর

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগে ‘সেই বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ’ বলে অনেক শোরগোল উঠেছিল। নয় বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের কোনো পূর্ণাঙ্গ সফর, তুলনা টানাই স্বাভাবিক। তুলনা টেনে দেখা গিয়েছিল, ২০০৮-এর তুলনায় এবার ভালো করার কথা বাংলাদেশের। এ দলের কী নেই? প্রতিভা, অভিজ্ঞতা, অধিনায়ক এবং এক গাদা কোচ! কিন্তু সফর শেষে প্রাপ্তির হিসাব মিলাতে গিয়ে শূন্য তো দূরে থাক, সবকিছু ঋণাত্মক জুটছে বাংলাদেশের কপালে! এই সফরের দুঃসহ স্মৃতি দ্রুতই ভুলে যেতে চাইবে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।

টেস্ট সিরিজ দিয়েই শুরু করা যাক। সাকিব আল হাসানকে ছাড়াই টেস্ট খেলতে গিয়েছিল দল। তবু নয় বছর আগের দলটি থেকে এগিয়ে রাখতে হচ্ছিল এবারের স্কোয়াডকে। এ দলের ব্যাটসম্যানরা টেস্টে বড় ইনিংস গড়তে জানেন, বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের স্বাদ কী, সেটা জানেন। বোলাররাও টেস্ট ম্যাচ জেতানো স্পেল করে অভ্যস্ত। অন্যদিকে, চোটের কাছে হার মেনে প্রতিপক্ষের মূল পেস আক্রমণই মাঠের বাইরে। তাই প্রত্যাশার বেলুন না ফুলিয়েও ভালো কিছুরই প্রত্যাশা ছিল।

ওয়ানডে সিরিজেও প্রোটিয়াদের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে বাংলাদেশ। ছবি: এএফপি

প্রথম টেস্টেই সে বেলুন চুপসে গেল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সর্বনিম্ন (৯০) রানে গুটিয়ে গেল বাংলাদেশ। রানের হিসাবে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হারের (৩৩৩ রান) রেকর্ডও গড়ল মুশফিক বাহিনী। চাইলে অবশ্য সেখান থেকেও সান্ত্বনা খুঁজে নেওয়া যায়—যাক ইনিংস ব্যবধানে হার তো আর নয়! দক্ষিণ আফ্রিকায় এর আগে প্রতিটি টেস্টেই যে প্রতিপক্ষকে দুবার ব্যাট করার সুযোগ দেয়নি বাংলাদেশ। দ্বিতীয় টেস্টেই সে ‘সান্ত্বনা’টাও জুটল না। এবারের হার ইনিংস ও ২৫৪ রানের। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে নিজেদের সবচেয়ে বড় হারের রেকর্ড গড়েই টেস্ট সিরিজের ইতি টানল বাংলাদেশ।

দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সিরিজ বলেই টেস্টের হতাশা অতটা প্রকট হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্টে তো অনেক বাঘা বাঘা দলই নাকানি-চুবানি খেয়ে ফেরে। ওয়ানডে সিরিজ সামনে রেখে আশায় বুক বেঁধেছিলেন সবাই। অন্তত ওয়ানডেতে তো বাংলাদেশ আসলেই ‘বদলে যাওয়া’ দল। ‘বদলে যাওয়া’ বাংলাদেশ তো তার আসল রূপে দেখা দেয় ওয়ানডেতেই। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার (র‍্যাঙ্কিং যা-ই হোক না কেন) সাকিব ফিরছেন দলে। ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক’ মাশরাফি বিন মুর্তজাও তাঁর সঙ্গী হচ্ছেন। সিরিজের প্রথম ৫০ ওভারেও সে স্বস্তিটা ছিল বাংলাদেশের। মুশফিকুর রহিমের অনবদ্য এক সেঞ্চুরিতে ২৭৮ রান তুলল দল। কিন্তু ফিল্ডিং শুরু হতেই উধাও সে স্বস্তি। এত দিন তবু দুই দেশের মধ্যকার রেকর্ড ভাঙা হচ্ছিল। কুইন্টন ডি কক ও হাশিম আমলা এবার বিশ্ব রেকর্ডে চোখ রাখলেন। বিনা উইকেটে রান তাড়া করার আগের বিশ্ব রেকর্ডটি গুঁড়িয়ে দিলেন নিমেষেই। আর ৫টি রান করার সুযোগ পেলেই উদ্বোধনী জুটির বিশ্ব রেকর্ডটি হয়ে যেত সেদিন।

দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও আরেকটি বিশ্ব রেকর্ড হাতছানি দিচ্ছিল। তবে রুবেলের বলে আউট হয়ে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ডটি আর গড়তে পারেননি এবি ডি ভিলিয়ার্স। তবে হারের ব্যবধান এক শর নিচে নামাতে পারেনি বাংলাদেশ। তৃতীয় ওয়ানডেতে সাফল্যই বলতে হবে, কোনো প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানকে দুই শ কিংবা দেড় শ দূরে থাক, সেঞ্চুরিই পেতে দেয়নি বোলাররা। তারপরও ৩৬৯ রান তুলে ফেলল স্বাগতিক দল। যেটি আবার সেঞ্চুরিবিহীন কোনো ইনিংসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড! সে রান তাড়া করতে নেমে ২০০ রানে হারে হলো আরেক কীর্তি, দেশের বাইরে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হারের রেকর্ড এটি।

মিলারের দ্রুততম সেঞ্চুরিটা জানিয়ে দিল পুরো সফরটা কেমন কেটেছে বাংলাদেশের। ছবি: এএফপি

২০০৮ সালের সিরিজের সঙ্গে তুলনা টানলে অতীতকেই এগিয়ে রাখতে হচ্ছে। প্রকৃতির বাধায় একে তো সেবার মাত্র দুটো ম্যাচে হারতে হয়েছিল, আর হারের সর্বোচ্চ ব্যবধানও ছিল ১২৮ রানের। বিশ্ব রেকর্ড নিয়ে অন্তত ভাবতে হয়নি!

এবার নেওয়া যাক টি-টোয়েন্টির খতিয়ান। নয় বছর আগে একমাত্র টি-টোয়েন্টিটি ছিল সফরের উজ্জ্বলতম দিক। ১৪ ওভারে নেমে আসা ম্যাচে শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে থাকা দল হেরেছিল ১২ রানে। ডেল স্টেইন, মরকেল ভ্রাতৃদ্বয় ও ইয়োহান বোথা-সমৃদ্ধ বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে সেটাও কম কী। আর এবার দক্ষিণ আফ্রিকা ‘সবেধন নীলমণি’ কাগিসো রাবাদা ও ইমরান তাহিরকেও ছুটিতে পাঠিয়ে দিল। ফল, প্রথম ম্যাচে সৌম্য-সাইফউদ্দীনে ‘একটুর জন্য’ দীর্ঘশ্বাস সৃষ্টি। আর দ্বিতীয় ম্যাচে ডেভিড মিলারের দ্রুততম (৩৫ বলে) সেঞ্চুরির রেকর্ড। এ বিশ্ব রেকর্ডের পাশে বাংলাদেশের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় ইনিংসের (২২৪) রেকর্ডকেও বড্ড মামুলি মনে হচ্ছে!

সফর শেষে তাই ‘সেই বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ’ তুলনাটা বড্ড খেলো শোনাচ্ছে। নয় বছর আগের বাংলাদেশই যে এগিয়ে!