সাড়ে আঠারো হাজার বিয়ে দিয়েছেন এই ঘটক পাখি ভাই

আলোচিত সংবাদ বাংলাদেশ

খুলনা নিউজপ্রিন্টে চাকরি করার সময় ১৯৬৭ সাল থেকেই ঘটকালি শুরু করেন পাখি ভাই। তবে এই ঘটকালিই যে একদিন পেশা হয়ে যাবে তা কখনই ভাবেননি। ৭৩ সালে নিজের আলসার ধরা পড়লে চাকরিতে অযোগ্য হয়ে পড়েন। তখন থেকেই ঘটকালিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ঘটক পাখি ভাই।বাবা-মার দেয়া কাজী আশরাফ হোসেন নামে গত চল্লিশ বছরে কেউ তাকে ডাকেনি। সবাই তাকে ঘটক পাখি ভাই নামেই ডাকে। খুলনা নিউজপ্রিন্টে চাকরির সময় পাত্র পাত্রীর খোঁজে ছোটাছুটি করতে দেখে কেউ একজন একদিন বলে ফেলল ‘ওই পাখি ভাই’। আর অন্যরাও মনে করলেন যে এই ব্যক্তিটির নামই বুঝি পাখি ভাই। আর সেই থেকেই এই নামে পরিচিতি পেতে যান তিনি। তবে নামটি আশরাফ হোসেনেরও পছন্দ হয়। তাই তিনিও এর বিরোধিতা করেননি। পাখি ভাই আরটিভি অনলাইনে বলেন, দীর্ঘ ৪৫ বছরের এই পেশায় এখন পর্যন্ত আমার মাধ্যমে বিয়ে হয়েছে সাড়ে ১৮ হাজারের উপর। চলতি মাসেও কয়েকটি বিয়ে হবে। আর শীতকাল চলে আসছে তখন তো বিয়ের ধুম পড়ে যাবে। একই পরিবারে ২৬টি বিয়ে এবং মা ও মেয়ের বিয়ে দেয়ার একাধিক রেকর্ডও রয়েছে আমার। এখনও অনেক পাত্রী আছে যার মায়ের বিয়ে আমিই দিয়েছি এখন মেয়ের ঘটকালি করছি। সুন্দর ডেকোরেশনে সুসজ্জিত অফিসে ৮ জন দক্ষ নারী সহকর্মীকে নিয়ে পাখি ভাইয়ের অফিস। তবে শুরুর দিকে এতো মসৃণ ছিল না পাখি ভাইয়ের জীবন। সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে রাতে পানি খেয়ে হোটেলে ঘুমিয়েছেন, এমন রাত তার প্রায় কাটাতে হতো। হোটেলের ভাড়া দেয়ার মতো টাকা থাকতো না প্রায়ই। মূল্যবান কিছু বন্ধকের বিনিময়ে হোটেলে থাকতে হয়েছে।তবে জীবনের গতি পাল্টাতে থাকে ৮০ সালের পর। তখন ব্যাগ ভর্তি হয়ে উঠে পাত্র পাত্রীর ছবি ও বায়োডাটা দিয়ে। সারাদিনই ব্যস্ত সময় কাটতো পাত্র পাত্রীর বাসায় বাসায় ঘুরে। ১৯৮৩ সালের কথা। একদিন একজন ব্যাংকের ম্যানেজার বললেন যে, এভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কত দৌড়াবেন, তার চেয়ে কোনো একটি নম্বর দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন। তার কথা মতো যে হোটেলে থাকতেন সেই হোটেলের নম্বর নিয়ে ইত্তেফাকে বিজ্ঞাপন দিলেন। এরপর কয়েকদিন হোটেলে এতো ফোন আসলো যে, ১৫ দিনের মাথায় হোটেল ম্যানেজার হোটেল ছাড়তে বাধ্য করলেন।পাখি ভাইয়ের বিপদ আরও বেড়ে গেল। বাসা ভাড়া নিলেন। কিন্তু টেলিফোন পাবেন কিভাবে? পরিচিতদের নম্বর দিয়ে কয়েকদিন বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, কিন্তু তারাও বিরক্তবোধ করায় নিজেই টেলিফোন নিয়ে বাসা ভাড়া নিলেন। কিন্তু বেশি মানুষের আসা যাওয়া হওয়ায় সেই বাসাও ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় ইস্টার্ন প্লাজায় ৬০ হাজার টাকা অগ্রিম ও ৩ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে রুম নেন। পাখি ভাই জানান, সেই থেকে এখন পর্যন্ত ইস্টার্ন প্লাজায় বিভিন্ন ফ্লোরে ভাড়া নিয়েই আছি, তবে এখন আমার অফিস ভাড়াই দিতে হয় দেড় লাখ টাকা।

৪৫ বছরের ঘটকালি জীবনে সাড়ে ১৮ হাজারের বেশি ছেলেমেয়ের বিয়ের ঘটকালি করেছেন। কখনো নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে ঘটকালি করেছেন। তবে পেশা হিসেবে নেওয়ার পর থেকে তিনি তার প্রতিষ্ঠানে পাত্র পাত্রীর খোঁজের জন্য নির্দিষ্ট একটি ফি নেন। তবে সবার বেলায় এক রকম ফি নেওয়া হয় না। পাত্র পাত্রী খোঁজা বাবদ যে খরচ হয়, তা এ ফির মধ্যেই ধরা হয়। বিয়ে হয়ে গেলে দুই পক্ষ খুশি হয়ে যা দেন তাই নেন। তিনি বলেন, ‘খরচটা উঠে আসে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর। আমার আর কোনো চাওয়া থাকে না। আমার মাধ্যমে একটি বিয়ে হয়ে গেলে আনন্দটাই বড় পাওয়া। এরপর দুই পক্ষ খুশি হয়ে যা সম্মানি দেয়, তাই নিয়ে থাকি। এটা নির্ভর করে পাত্র-পাত্রীর অবস্থার ওপর। কেউ ২০ হাজার দেয়, কেউ ৫০ হাজার। যারা কোটি টাকা খরচ করতে পারে, তারা আরও বেশিও দেয়। ঘটকালি পেশার সূত্রে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন পাখি ভাই। বিধবা পাত্রীর জন্য পাত্র খুঁজতে খুঁজতে এক সময় প্রেমে জড়িয়ে নিজেই বিয়ে করেন তাকে। তবে পরিবারের সম্মতিতে ১৭ বছর বয়সে প্রথম বিয়ে করেন তিনি। প্রথম স্ত্রী বরিশালে ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে এখন ঢাকায় থাকেন।পাখি ভাই জানান, জীবনে অসংখ্য ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সে তালিকায় যেমন আছে মন্ত্রীপুত্র-কন্যা, সচিব, এমপির ছেলেমেয়ে, ব্যাংক কর্মকর্তা, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টট্যান্ট, পুলিশ কর্মকর্তা, সামরিক অফিসার, স্বল্প বেতনের চাকুরে, তেমনি এই তালিকায় রয়েছে রুপালি জগতের অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে শুরু করে খবর পাঠক-পাঠিকারাও। বিদেশ-ফেরত ছেলেমেয়ে তো আছেই।তাকে নিয়ে ইতোমধ্যেই আল জাজিরা টেলিভিশন, বিবিসি, গার্ডিয়ানসহ দেশ বিদেশের অনেক মিডিয়ায় সংবাদ হয়েছে। এসব খবরে কখনও তাকে বাংলাদেশের লাভগুরু, সফল জুটির সাধক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এতো বেশি বিয়ের জুটি মিলিয়ে দেবার রেকর্ড বিশ্বে আর কারও আছে কিনা সে বিষয়ে কোনও মিডিয়া নির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি।

পাখি ভাই বলেন, দীর্ঘ এই ঘটকালি জীবনে কখনও কারও কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে এক টাকাও নেইনি। যা বলেছি সে কথা ঠিক রেখেছি। যার জন্য মানুষ আমার কাছে এসে আস্থা রাখে। কোন কাজ সততা ও পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে করলে সফলতা আসবেই। আমি জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু কখনও প্রতারণা করেনি। সততার সাথে এখনও ঘটকালি করছি, যার জন্য সফলতা পেয়েছি।তিনি বলেন, এখন ফেসবুকের মাধ্যমে অনেকেই পছন্দ করে বিয়ে করছে। যার জন্য ঘটকালির মাধ্যমে বিয়ে কিছুটা কমেছে। কিন্তু ফেসবুক বা নিজেদের পছন্দের বিয়ে বিপদে পড়ছে অসংখ্য ছেলেমেয়ে। পরিবারের সম্মতি ও ঘটকের মাধ্যস্থতায় বিয়ে হলে সেখানে ছেলেমেয়েদের বিপদে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। যেকোনও বিয়ের বিষয়ে আমার পরামর্শ হচ্ছে ছেলেমেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে ভালোভাবে খোঁজ খবর নিয়ে তারপর বিয়ের আয়োজন করেন। আজকাল প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে ছেলেমেয়ে উভয়েই প্রতারিত হচ্ছে। এখন আবার বেশি টাকা কাবিন দিয়ে বিয়ে করে পরে দ্রুত সময়ের মধ্যে ডিভোর্স দিয়ে সেই টাকা উঠিয়ে নেয়ার প্রবণতা খুবই বাড়ছে। এই কাবিন ব্যবসা বন্ধ করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।